ব্রেকআপ
ব্রেকআপ
আদিমা মজুমদার
সোনাই রোড, শিলচর -৬
রাঙ্গির খাড়ি নেতাজি মূর্তি ছেড়ে দক্ষিণে সোনাই রোড। জনসন অটোমোবাইলস এর পাশের গলিতে বিতান এর বাড়ি। গেটের সামনে ওয়েলকাম ট্রি দুটো। ঘরের নাম " দয়াল কুটির" ঘরে ঢুকে ভীষণ আরাম লাগল। বাইরে প্রচন্ড গরম। দক্ষিণের জানালা দিয়ে শোঁ শোঁ বাতাস ঢুকছে। ঘরটা সুন্দর পরিপাটি করে সাজানো গোছানো। ফলস সিলিং করা। দেয়ালগুলো বাঁশের তরজা দিয়ে তিধারা বানের কুঁড়েঘর মনে হচ্ছে।সাবেকি আসবাব।
উত্তরের দেয়ালে র্যাকভর্তি বই। মাঝে মাঝে রবীন্দ্র -নজরুল প্যারিয়ার কাল মার্কস এর ছবি। মা বাবার বিয়ের একখানা ফটো বড় করে বাঁধানো, বিতানের ছোট থাকার ফটো জ্বলজ্বল করছে দেয়ালে।পাশের রুমে শোকেসে সাজানো বিভিন্ন দেশের পুতুল। গিটার হারমোনিয়াম...
বিতান টেবিলে ল্যাপটপের ব্যাগটা রেখে একটা ফোন কল রিসিভ করে। আমার দিকে ইশারা করে বসতে বলে। আমি সারা ঘর হাঁটতে থাকি। ছোট্ট একটা কিচেন। ফ্রিজ খুলে দেখি চিজ পরিজ কাস্টার্ড ব্রেড ডিম সস্ পড়ে রয়েছে, সেলফে ৪/৫ টা বাসন কুশন কাপ চামচ গ্যাস স্টোভ মাইক্রোওভেন। তাহলে বিতান কি আলাদা খায়? মা বাবা ছাড়া তো তার দ্বিতীয় কেউ নেই।
নিচে নেমে বিতান কোলাপসিবল গেট লাগিয়ে দেয়। এরই ফাঁকে আমি ভালো করে সব দিক তাকিয়ে দেখি । নাহ খারাপ না। আমার ভেতর কেমন যেন কী একটা আনন্দের ঢেউ উথলে উঠে।
বিতান আমার কপালে আলতো একটা চুমু খেয়ে বলে, কি বানাবো চা না কফি? __ কিছুই খাব না। ' আয়েম এক্সট্রিমলি টায়ার্ড।' তোমার ফ্রিজে সয়াসিড ভেজানো ছিল আমি খেয়ে নিয়েছি।
__ তাহলে নিচে চলো, মা বাবার সাথে পরিচয় করে দেই।
__ভয় লাগছে বিতান..
__ ভয়ের কোন কারণ নেই। তুমি আসবে বলে জানিয়ে রাখছি।
মায়ের সামনে আমাকে নিয়ে বলে, ' মা এই যে মাহি। ' মা আমার চিবুকে আঙুল ছুঁইয়ে বলেন আলহামদুলিল্লাহ! এই শ্যামলা রংটা আমার খুব পছন্দের।
বাবা বিছানায় শোয়া। কাছে বসলাম। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেন, ভালো থেকো মা। 'আমার চার পাঁচ দিন পর পায়খানা হয়। প্রসব যন্ত্রণা অনুভব করি। কোন দুশমনের যেন এই রোগ না হয়। 'বড় মায়া লাগে। বেচারা।
হেলপার মেয়েটি ডাইনিং টেবিল সাজিয়ে রেখেছে জলখাবার দিয়ে। বিতানের মা চেয়ারে বসে এটা আন সেটা আন ফরমাইস করছেন। একটা তাজা ফুলের গুচ্ছ টেবিলের একপাশে রাখা, সাথে ত্রিকোণ করে বাজ করা টিস্যু পেপার। ডাইনিং স্পেসটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন।
_ _ এত আয়োজন কেন আন্টি
__ না না কিছু না। রাতে ভাত না রুটি খাবে?
__ না আন্টি, আমি চলে যাব
__ বাড়িতে, না অফিস কোয়ার্টারে?
__ বাড়িতে, মার শরীর খারাপ।
__- অনেকদিন ধরে শুনছি মা অসুস্থ। মাকে ভালো ডাক্তার দেখাও, না হয় বাইরে একবার নিয়ে যাও।
__ এটাই ভাবছি আন্টি
##
মাহি তার মাকে বলে, ' মা আমার কিচ্ছু চাই না। হোক কালো, হোক সে মোটা কি টাক মাথা। অত্যন্ত জ্ঞানী মেধাবী বুদ্ধিদীপ্ত বিতান। পণ ছাড়া বিয়ে করছে, ভাবতে পারছো।
জমিলা চেয়ারেই বসেছিলেন গালে হাত দিয়ে। বললেন, আমি তো রাজি, তোর পাপাকে বুঝাতে হবে।
একটা পোকা মাহির ল্যাপটপের চারদিকে ঘুরতে ঘুরতে চিৎ হয়ে পড়ল টেবিলের উপর। সোজা হওয়ার চেষ্টা করছে, পারছে না। কয়েকবার ঘুরপাক খেয়ে স্থির হয়ে যায়। মাহি এক টুকরো কাগজ দিয়ে পোকাটাকে সোজা করে দিতে জানালা দিয়ে উড়ে যায়। তারপর খুব মনোযোগ দিয়ে নেটে ডুবে যায়।
##
দুই সপ্তাহ ছুটি নিয়েছিল মাহি, বিয়ের জন্য। আজ জয়েন করবে। গতরাতে খাবার টেবিলে বসে শাশুড়িকে কথাটি বলে। শাশুড়ি বলেন তুমি কি রান্না করে খেতে পারবে?
_-- আমরা তিনজন মেয়ে একসঙ্গে থাকি, হয়ে যায়। মিলেমিশে করে ফেলি, আপনি তো আমায় রান্না ঘরে ঢুকতেই দিলেন না।
__ হ্যাঁ মাহি, আমি যা কষ্ট পেয়েছি চাকরি আর সংসার করে, চাই না আমার মত অন্য মেয়েরা তাই করুক। অফিসে কত কাজ থাকে, তা সম্পন্ন করে বিকেলে ঘরে এসে আবার রান্নাবান্না গুছানোর কাজ করলে মেয়েদের উপর অত্যাচার হয়, আমি মনে করি।
ঘর মোছা বাসন মাঝা কাপড় ধোয়া যে কেউ করতে পারে। তুমি যে ডিপার্টমেন্টে কাজ করছ সেই কাজগুলো কি অন্য কেউ করতে পারবে? না, পারবে না। পড়াশোনা করতে দিনকে রাত করেছ, এখন আর কষ্ট করো না। আমি যতদিন পারবো তোমাদের জন্য করে যাব। তারপর তুমি ভালো একটা মেয়ে রাখবে। কাজের জন্য। বেতন দেবে এবং পারলে তার পেনশনের ও ব্যবস্থা করবে।
অফিসে দুপুরে কি নাস্তা দেয়? না দিলে নিজে টিফিন নিয়ে নিও। নিজের শরীরের খেয়াল রেখো কিন্তু।নিজেকে ভালোবাসতে শেখো।
শাশুড়ির কথা শুনে মাহি ভাবে স্বপ্নেও এরকম শাশুড়ি পাব চিন্তা করিনি। কি সুন্দর ব্যবহার! প্রথম প্রথম মনে হয় আদর করছেন, পরে প্রকৃত রূপ দেখাবেন।
##
পোলাও মুরগির খুরমা বের করে মাহি ফ্রেন্ডদের দেখায়। আমার শাশুড়ির নিজের হাতে বানানো খেয়ে দেখো। গন্ধে মো মো করছে।কোনো কোনো সপ্তাহে শনিবার ট্রেনে করে চলে আসে মাহি শশুরবাড়িতে। একটা কিসের টান অনুভব করে, অথচ বিয়ের এক সপ্তাহ পরে চলে যায় বিতান, চন্ডীগড়।
একবিংশ শতাব্দীতে এমন শশুর শাশুড়ি যে আছেন ভাবতেই অবাক লাগে মাহির। বান্ধবী সুলেখার ডিভোর্সের গল্প শুনে আতঙ্কে তার বুক কাঁপতো। কি হয়, কি হয়। সুলেখা বলতো তার স্বামীর ফিলিংস বলে যে একটা জিনিস আছে সেটা একজিস্টই করেনি।
মাহির মা বাবা ও একখাটে শুয়ে দুজন দুই পৃথিবীর মনে হতো। সারাদিন ঝগড়া বিবাদ কথা কাটাকাটি। কোনদিনই মাহি একটা সুন্দর অ্যাটমসফিয়ার পায়নি।
##
শনিবার মাহি আসবে। বিকেল ছ' টায় ঘর পাবে। শাশুড়ি খবর শুনে স্যান্ডউইচ বানিয়ে রাখেন। পাতলা পাউরুটির ধার সযত্নে ছেঁটে ভেতরে মেয়নিজের আস্তরণ, মাঝখানে গাজর কিরা পিঁয়াজ কুচি কুচি করে কেটে দিয়েছেন।
মাহির ভালোলাগা মন্দ লাগা নিয়ে বিতান ও এতটা ভাবেনা, শাশুড়ি যতটুকু ভাবেন। নিজের মেয়ের মত। একদিন বলেছেন' তুমি আমার মেয়ে মাহি '।এই সংবেদনশীল মানুষটার জন্য কি করা যায়?
সেদিন বিকেলে ছাদে উঠে একবার চারদিকে ঘাড় ঘুরায় মাহি, ডানদিকে খোলা জমি। পুবের দুতালা ঘর, চাচা শশুরের। সামনে গ্যারেজ দু'ভাইয়ের একসঙ্গে।কত মিল ভাইয়ে ভাইয়ে। স্থলপদ্মের গাছ ভর্তি সাদা পিঙ্ক ফুল, দোতলা পর্যন্ত উঁকি দেয়। একটি ডাল বেঁধে রেখেছেন রডের সাথে, যেন বাতাসে পড়ে না যায়।
পশ্চিমের দোলনায় বসে কত ভাবনা খেলে যায় তার মাথায়। দু'বছর আগে বিতানের বন্ধু সাদেকের সাথে প্রেমে জড়িয়ে পড়েছিল মাহি। সামান্য কথা কাটাকাটি নিয়ে ব্রেকআপ হয়ে যায়। ভাগ্যিস ব্রেকআপ হয়েছিল। ধেমড়া বয়স্ক অবিবাহিত নোনাশের পাল্লায় পড়ে প্রাণ যেত।
##
বিয়ের বছরের শেষে কনসিভ করে মাহি। শ্বশুর-শাশুড়ি মাথায় রাখবেন না কোথায় রাখবেন খুঁজে পান না। বিনা বেতন ছুটি মঞ্জুর করিয়ে তিন মাসের জন্য বাড়িতে নিয়ে আসেন। বিতান ও ছুটি নিয়ে বাড়ি চলে আসে। ঘরটি জান্নাতের রূপ নেয়। এবার মাহিকে রান্নাঘর পুরো বন্ধ করে দেন শাশুড়ি। সারাদিনের ডায়েট চার্ট বানান, ডাক্তারের পরামর্শ মত। গুণ গুণ গান করেন, -
" আমি মাটির একখান ঘর বানাবো / খেজুর পাতা ছাউনি দিবো / বাঁশের খুটির বেড়া দিয়ে / মহাকালের ঘুম ঘুমাবো... ”।
ছেলে বিতান নানা স্বাদের বই পার্সেল করে নিয়ে আসে পড়ার জন্য।
স্মার্ট বাজার থেকে অনেক গুলো জিরো সাইজের বাচ্চার কাপড় নিয়ে এসে, পাটকরা বিছানায় ফেলে, মাহিকে জিজ্ঞেস করে, হলো?
কেন হবে না, বাবা যে কমরেড।
আকাশে পূর্ণ চাঁদ। মায়ের আঁচল ধরে তাকিয়ে থাকে বিতান।দেখি গোটা একটা চাঁদ তার জ্যোৎস্না ভেজা শরীরে সমস্ত আলোটুকু নিয়ে খুব ধীরে ধীরে হেঁটে আসছে আমার দিকে।
"
Comments
Post a Comment