লকডাউনের শেষ দিন

2020 সালের জুন মাসের আট তারিখ আজ। লকডাউন প্রায় শেষ হয়েছে।। ঝাঁকে ঝাঁকে পাখির মত মানুষ পথে বেরিয়েছে। পথঘাট আর যেন আগের মত নেই। ফিঙ্গে পাখিটি বাবলা গাছের ফুল ভর্তি ডালে বসে দেখছে মানুষের হল্লা চিৎকার। দুপুরবেলা চৌধুরী বাবু রাস্তায় বের হন। মোড়ের দোকানে জিজ্ঞেস করেন,ও বা তজই জীবনলাল নাপিতকে কি দেখেছিলে সারাদিনে? তজই দোকানের মাকড়সার জাল পরিষ্কার করতে করতে বলে, তিন মাস তো ঘরেই ছিল, চুল দাড়ি কারো কাটতে পারেনি।আজ মনে হয় সেলুন খুলতে গেছে। চুলকানি আর সহ্য করতে পারছিনা বলে ফিরে আসছিলেন চৌধুরী বাবু, মাঝপথে দেখা হয়ে যায় জীবন লালের সাথে।

__আরে আমি তোমাকে খুঁজতে গিয়েছিলাম রাস্তার মোড়ে, সেলুন খুলবে কি আজ।

__  না বাবু, টিকিট করতে স্টেশন যাবো।  লকডাউন এর সময় মা মারা যায় আপনি তো জানেন, মাকে তো দেখার সুযোগ হয়নি। ছোট ছোট ভাই বোন খুব কষ্টে আছে। একটা টাকাও পাঠাতে পারেনি,  কি করে বাঁচছে জানিনা। আপনাদের জন্য যেভাবেই হোক আমি জীবিত আছি। আপনার ঋণ শোধ করতে পারব না

                  করোনা আর লকডাউন মানুষের জীবনে একটা বড় আঘাত এনেছে। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ ভীষণ বিপদের সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। কিছু দুর্ঘটনা ছিল বড়ই মর্মান্তিক। এ এক কঠিন অন্ধকার সময়।" মানুষ বড় কাঁদছে। আমি সেই হাতটা খুঁজছি, সেই ভরসার হাত।" লেখকের শ্বাশত বাণীটি চৌধুরীবাবুর মনে পড়ে।

                     বছর চল্লিশের যুবক জীবন লাল। বাড়ি বিহার 'বেটি মারা 'গ্রামে। সে আজ আট বছর থেকে শিলচরের বাসিন্দা। হিন্দিভাষী হয়েও এত সুন্দর বাংলা বলে, যে কোন বাঙালি তাতে লজ্জা পাবে।

___ জীবন লাল তোমাকে স্টেশন যেতে হবে না। আমার ছেলে অনলাইন থেকে টিকিট করে দেবে। কবিতা গল্প না লিখলেও লকডাউন মুখের আদল কবি লেখকদের মত হয়ে গেছে। এসো একবার তোমার বাক্স নিয়ে, মুখ মাথার জঙ্গল গুলো একটু সাফ করে দেবে।

            চৌধুরী বাড়ির কারো কথা সে ফেলতে পারেনা। ঘরে গিয়ে ছুরি-কাঁচি নিয়ে আসে।

__-বাবু আইন, বইছি উঠানো।

___-না না ঘরে আও। আমার মেয়ে আজ কিতা কিতি বানাইছে ভাই কোয়ারান্টাইন থাকি আইছে। যে খুশি তারা।

__-__ এসো  এসো, বসো দাদা, এখানে বসো।

___-  দে বইন, বেজান ভুখ  লাগছে। সকাল থাকি পাগলর  লাখান খালি আটিয়ার।

                      জয়ীষা এক ডিশ পোলাও  মুরগির কোরমা ড্রইংরুমের টেবিলে রাখে। গন্ধে ঘর মো মো করে। পাশের রুমে গান বাজে_
" গাও ছোড়ব নেহি, জঙ্গল ছোড়ব নেহি,  মাই- মাটি ছোড়ব নেহি, লড়াই ছোড়ব নেহি। "কতদিন পর জীবনলালের শুকনো হৃদয়খানি যেন ভরে  উঠে।
____খাও দাদা খাও, হাত লাগাও। জাত যাইতো না।
____-জাত গেলে কি এতদিন ধরে মুসলমান পাড়ায় থাকতাম।

____- ঢং করিয়ার দাদা।খারাপ পাইও না।
  __---      শুন বইন আইজ একটা সত্যি কথা কই।
    পয়লা যেদিন বড়ভূইয়ার ঘরো আই কেরোসিনের স্টুবে চাউলের লগে আলু একটা আর বেন্ডি একটা দিয়া সিদ্ধ ভাত বানাই। খাইতাম পারছিনা, বমির ভাব। কেরোসিন আর মুসলমানের গন্ধ একাকার ওই গেছে।

__---হা হা হ, দাদা তুমি হাসাইয়া মানুষ মারবায়। ____আমার লগে আরেক বিহারী আইছিল, ঘুম থাকি উঠিয়া কয় তু রেহনে দে, মে নিকাল রহা হু। গেছে গিয়।আটকাইতে পারছি না।

       _____ তে  মুসলমান পাড়াত আইলায় কেনে? 
_____সস্তা পাইছি, বুঝস নানি।
__-__আমরা কই তুমরার  গতরো গন্ধ, তোমরা কও আমরার। একটা গন্ধ আছে ঠিকই,  মনে অয় ইটা আমরার মনর গন্ধ।

      গল্পে  খাওয়া ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে, খাও দাদা।
_---_--বাবু খাবেন না?
____-না না তুমি খাও, আমার ডায়াবেটিস,  খেলে  সুগার বেড়ে যাবে। আমি শুধু এক কাপ লাল চা খাবো।

                  জীবন লাল ভাবে বেশ আছেন উনারা। আমার মত খেটে খেতে হয় না। ভালো ভালো খাদ্য মজুদ আছে কিন্তু খেলে সুগার বাড়ে। কি দুর্ভাগ্য তাঁদের।

                কি সুন্দর সাজানো  বৈঠকখানা। বড় বড় জানালার পাট। বেতের মোড়ার কারুকার্য দেয়ালে  টাংগানো কাল মার্কসের ফটো দেখে সে চিনতে পারে। মজুরি শ্রমিক ইউনিয়নের অফিসে সে দেখেছে। মিউজিক! স -ব যেন এক স্বপ্ন। __চৌধুরী বাবু বলেন জীবন লাল তুমি এখন বাড়ি যেও না। গেলে 14 দিন কোয়ারান্টাইন করবে। দুদিন পরে যাও।

____আব্বু, তুমি বড্ড ভাবো। দাদা তার জন্মদাত্রী মায়ের মুখ শেষবার দেখতে পারেনি। তার মনের কথা একবার ভাবো।

        একটু পরে আবার ট্রে ভর্তি করে নারকেলের নাড়ু, ঘি দিয়ে ভাজা হালুয়া এবং বড় একটা কাপে এক কাপ চা এনে সামনে রেখে যায়। হেলপার মেয়েটি।

             আউর কিতনা খিলাওগে। জবসে লকডাউন হুয়া তবসে আপই লোগই  ত সাহারা বন গয়া। প্রাণ খুলে হাসে জীবনলাল।

       বিরাট বড় চারতলা বাড়ি। নাম 'আশ্রয়।' উঠোনের একপাশে লাল বেলেনো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। অন্যদিকে একটা ডালিম গাছ। ডালে ডালে ছোট ছোট পাখি খেলা করছে। ছোট বড় টবে  ফুটে আছে নানা প্রজাতির ফুল। গোলাপ-টগর জবা অপরাজিতা গন্ধরাজ। আরেকটা হলুদ ফুলের ভেতর যেন রাধাকৃষ্ণের মূর্তি। সমস্ত বাগান জুড়ে এক অপূর্ব মুখরতা!

       তার মাঝখানে বসে চৌধুরীবাবুর চুল কাটে জীবন লাল। গলা ঘাড়ে মেসেজ করে। আরামে বাবুর চোখ  ভরে ঘুম আসে। জীবন লাল তার ফেলে আসা গ্রামের গল্প করে।

     বাবা যেদিন মারা যায় বাবু, সেদিনও আমি বাড়ি ছিলাম না।

__--- ওহ, বড় দুঃখের কথা। কি হয়েছিল বাবার। __-_-বাবু আমরা চিরদিনই গরিব মানুষ। একজোড়া বলদ ছিল আমাদের। তা দিয়ে বাবা হরিশ মহাজনের জমিতে হাল বাইতো। আষাঢ় মাসের এমনই এক আকাশ ভাঙ্গা বর্ষণে বিজলি পড়ে, বলদ সহ বাবা মারা যান। আমি তখন ব্রহ্মপুত্র এক্সপ্রেস চড়ে আসাম মানে শিলচর আসছি। বন্ধু গয়ার সাথে।
_____সো স্যাড, বলে উঠেন চৌধুরীবাবু।

চুল কাটা শেষ হলে একটা 500 টাকার নোট বের করে জীবন লালের দিকে হাত বাড়ান ____খুচরো নেই বাবু।
_____রেখে দাও কাজ আসবে।
____ না বাবু, আর না। আপনাদের বিলি করা চাল ডাল এখনো ব্যাগে রয়েছে। আপলোগ ইতনা আচ্ছা, নাহি মিলনেসে  পাতাই নাহি হোতা। হায়  মাতৃভাষা কদিন বাঁচবে।

             জ্যৈষ্ঠের রোদে যেন আগুনের  আঁচ। জীবন লাল  পাড়ি দেয় তার জন্মভূমি।  মন তার খুব খুশি। এত বড়লোক, এত বড় মনের মানুষ তারা, এমন মানুষের সাথে তার দেখা হবে কোনদিন স্বপ্নে কল্পনাই করেনি। গ্রামে বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে এই গল্প সে করবেই। তার ভীষণ ভালো লাগে এই ভেবে যে চৌধুরীবাবুর মেয়ে তাকে ভালোবাসে। দাদা বলে ডাকে।

P.C - Google.com 


Comments

Popular posts from this blog

শিলচর মেডিকেল কলেজ