শিলচর মেডিকেল কলেজ
শ্রম, সেবা ও সংগ্রাম।
শিলচর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক নার্সের ৩৬ বছর --
আদিমা মজুমদার
রিটায়ার্ড অ্যাসিস্ট্যান্ট মেট্রন
মনে হলো নার্স হোস্টেল,
মনে হলো ইউক্যালিপটাস,
ফিরে যখন তাকাই দেখিবারে পাই
সান্তনার কিছু মিথ্যে সময়
খানিকটা শূন্যতা।
১৯৮৩ ইংরেজির ১৯ ফেব্রুয়ারি হালকা এক মন ভালো করা শীতে, শিলচর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নার্সিং ট্রেনিং এ সুযোগ মিলে।কতশত সুখ স্মৃতির হালকা মেঘ মনের ক্যানভাসে ভেসে বেড়ায় যেমন করে শরতের নীলাকাশে সাদা মেঘেরা ছুটোছুটি করে। ট্রেনিং এর ইন্টারভিউ যেদিন দিতে গিয়েছিলাম,সে সময় শ্রদ্ধেয় ডাক্তার অরুণ কুমার দাস আমার কাগজপত্র দেখে জানতে ছেয়েছিলেন, ' তুমি বিজ্ঞানের ছাত্রী? ' হ্যাঁ বলাতে দু'একটা প্রশ্ন করে বলেছিলেন, ' যাও তোমার হয়ে গেছে '।
' সামনে উজ্জ্বল ধূসর আলো প্রান্তর
ইচ্ছে পথে মায়াবী স্বর্গের সিঁড়ি '
১৯৮৭ সালের ৮ জানুয়ারি স্টাফ নার্স হিসেবে যোগদান করি একই হাসপাতালে। একজন স্বাস্থ্যকর্মীর জীবন আর দশটা কর্মজীবী মানুষের থেকে আলাদা। বিশেষ করে ডাক্তার এবং নার্সদের। কারণ এরা আমাদের সমাজের অতি মূল্যবান অংশ বলে মনে করি। তাই বলে অন্যদের মূল্যহীন বলছিনা। অন্য কাজ যে কেউ শিখে করতে পারে। নার্সিং বা ডাক্তারি সম্ভব নয়। খুব বেশি ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হয়। রাষ্ট্র ব্যবস্থা অন্যান্য কর্মচারীদের যেভাবে ছুটির ব্যবস্থা করে দেয়,স্বাস্থ্যকর্মীরা তা থেকে বঞ্চিত থাকে। তাছাড়া একজন স্বাস্থ্যকর্মীর উপর মানুষের প্রত্যাশা এবং ভরসা খুব বেশি থাকে।
নার্সিং শুধুমাত্র একটি পেশা নয় এটি শ্রম সহিষ্ণুতা ও আত্মত্যাগের এক দীর্ঘ সংগ্রাম। প্রথম দিন নার্স হোস্টেলে ক্লাস করতে গিয়ে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল _Why did you choose nursing as a profession? আমার উত্তর ছিল 'সেবার মাধ্যমে টাকা উপার্জন'। যেকোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে অতশত ভাবতাম না আজও ভাবি না।
নার্সিং ঃ এক নতুন জীবন
নার্সিং ট্রেনিং আমাকে জীবনের নতুন মোড় দেখায়। নিয়মকানুন শৃঙ্খলা পরায়ণতা, নিউজ পেপার পড়া,বই পড়া, মানুষের সাথে ব্যবহার সবই ক্লাস রুমের অংশ ছিল।নান সিস্টারদের সাবজেক্ট টিচার পেয়েছি।প্রফেসরের ক্লাস পেয়েছি।সিস্টার মেট্রন বারবারার কড়া শাসন সত্বেও সেদিন বিকেলে হোস্টেলের পেছনের ইউক্যালিপটাস গাছের নিচে বসে লিখে ফেলি কবিতা--
' নার্সিং এনাটমি ফিজিওলজি
সার্জারি মেডিসিন মাইক্রোবায়োলজি, কমিউনিটি হেলথ কি যে সাবজেক্ট
সিস্টার সান্ড্রা পড়ান একদম পারফেক্ট...'
তিন মাস ট্রেনিং এর পর যখন হাসপাতালে ডিউটিতে যাই, পরিচয় হয় ডাক্তারদের সাথে।বন্ধুত্ব হয়।
কলেজ ম্যাগাজিন 'ভীষক 'এ লিখি আমার প্রথম কবিতা ১৯৮৩ সালে।
' শ্মশানের ধোঁয়া ওরে কবরের মাটি /তোমাদের তরে বল কে বা হও খাটি/ কারে বাসি ভিন ওরে কার দিকে ছুটি /শ্মশানের ধোঁয়া ওরে কবরের মাটি...
অনেক সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়েছিল সেদিন। যাক সেসব দিনের কথা মনে হলে আজও গায়ে কাঁটা দেয়।
১৯৮৩ র ক্রিকেট বিশ্বকাপ দেখছিলাম আমাদের বাড়ির লেপা উঠোনে, টিভি বারান্দায় বের করে। বাবা আমার পাশে বসে বলেন, 'মাগো তুমি নাকি হিন্দু ধর্মে দীক্ষিত হতে চলেছো, আরো অনেক কথা। উত্তরে বলেছিলাম, ভয় পেয়ো না বাবা, মানুষের সেবা করতে করতে মানব ধর্মে আস্থা রাখতে শিখেছি।বাবা চুপ থাকেন।
৩৬ বছর রোগীর সাথে, মানুষের সাথে সংসার। প্রচুর পরিশ্রম। অন্যরকম অভিজ্ঞতা।
মানুষ নানা কথা বললেও নার্সিং আমার কাছে খুব ভালোলাগা একটা প্রফেশন। সেবা দিয়ে মনে শান্তি পাওয়া যায়।খুব কাছ থেকে হাসপাতালের পরিবর্তন দেখেছি,প্রযুক্তি বেড়েছে, পরিকাঠামো উন্নত হয়েছে, কিন্তু সেই আগের আন্তরিকতা, শ্রেনী বিন্যাসহীন সহযোগিতা সংস্কৃতি অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে।
" পরিশ্রমে যা কিছু অর্জন
তার পাশাপাশি বসে আছে
নিরুদ্বিগ্ন মন ঝড়ের মতন"
শিলচর মেডিকেল কলেজ ঃ এক ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান -
আসামে যে প্রথম তিনটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল স্থাপিত হয়েছিল, তার মধ্যে শিলচর মেডিকেল কলেজ একটা।ঘুংঘুর, শিলচর। ১৯৬৮ সালের ১৫ ই আগস্ট আমাদের স্বপ্নের মেডিকেল কলেজ স্থাপিত হয়,তা সর্বজন বিদীত। ১৯৫৭ ইংরেজিতে মহান ব্যক্তিত্ব মইনুল হক চৌধুরী ছিলেন বিধানসভার সদস্য। তারই সুবাদে মুখ্যমন্ত্রী বি বি চালিহা এবং সাংসদ ফখরুদ্দিন আলী আহমেদের নেতৃত্বে শিলচরে মেডিকেল কলেজের বৃত্তি প্রস্থর স্থাপন সম্ভব হয়। আমরা বাঙালিরা বড় ভুলোমনা, পারদর্শী নেতা মইনুল হক চৌধুরীর নাম আর কারো মনে নেই।
প্রফেসর রুদ্র গোস্বামী ছিলেন প্রথম প্রিন্সিপাল, উনি নিজের বাড়ির মতো করে সাজিয়েছিলেন মেডিকেল কলেজকে।কৃষ্ণচূড়া ফুলের পাতায় পাতায় আজও তাঁর নাম লিখা আছে।এই কর্মবীরকে বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই। মাত্র ৫০ জন ছাত্র নিয়ে এমবিবিএস ক্লাস আরম্ভ হয়। শিলচর গুরুচরণ কলেজে। এই কলেজের হোস্টেলেই কয়েকজন ছাত্র থাকতেন । তারপর প্রত্যেক বছর ধাপে ধাপে বাড়তে থাকে স্টুডেন্ট।শিলচর সিভিল হাসপাতালে প্রথম রোগী ভর্তি করা হয়,ছাত্ররা থাকতো Govt. Boys স্কুলে, জিসি কলেজ হোস্টেলে।১৯৮৫ সালে পোস্ট গ্রেজুয়েট কোর্স চালু হয়।বর্তমানে ২০ টি বিভাগে পোস্ট গ্রেজুয়েট কোর্স চালু হয়।
২০১০ সালে অনেক আন্দোলনের ফলে বিএসসি নার্সিং কোর্স চালু হয়।
শুরু হয় বিএসসি এম এল টি।অনেকটা অডিটোরিয়াম, লাইব্রেরি আছে।আছে বিরাট বড় খেলার মাঠ।
এডমিনিস্ট্রেটিব বিল্ডিংয়ের পাশে গড়ে উঠে নতুন প্রসূতি বিভাগ। সাথে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, SNCU, NICU,,PICU, ICU প্রায় ১০টি। মেডিকেল কলেজ মূলত একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। আজ কলেজের পরিকাঠামো অনেকটা স্বয়ংসম্পূর্ণ।
শুধু নিউরো সার্জন ছিলেন না, এখন তা পূরণ হয়ে গেছে। উত্তর পূর্বের এই হাসপাতাল, রোগীর জন্য চাতক পাখির কাছে একফোঁটা জলের মতন।
এই কলেজ কেবল চিকিৎসা শিক্ষার কেন্দ্র নয়,এটি শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি প্রতীক।
টিবি ওয়ার্ডের পাশে ক্যান্সার কেয়ার ইউনিট প্রতিষ্ঠিত হয়।বরাকের রোগীর চিকিৎসা নিতে আর তেমন করে বাইরে যেতে হয় না।নতুন
বয়েজ হোস্টেল, নার্সেস হোস্টেল, পিজি হোস্টেল বিশাল আকারে সম্প্রসারিত হয়েছে।
দাঁতের আউটডোর আর মেইন বিল্ডিং এ নেই, ভেটারিনারি বাজারের বিপরীতে আলাদা দন্ত চিকিৎসা কলেজ হয়ে যায়।
ফরেনসিক বিভাগ এর পাশে বড় বড় বিল্ডিং হচ্ছে, যা ভবিষ্যতের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে। আজ অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সংযোজনের মাধ্যমে শিলচর মেডিকেল কলেজ উত্তর-পূর্ব ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
" কত অভিজ্ঞতা কত মানুষ
দেখা হল কত রেশ দ্বেষ
এবড়ো -খেবড়ো পথ ফাঁদ
দুঃখ-কষ্ট বিবর্ণ বিষাদ '
শত ব্যস্ততার মধ্যে ও আমাদের সময়টা অন্যরকম ছিল।আমরা একদিকে রোগীর চিকিৎসা সেবা করতাম,অন্যদিকে নিজস্ব সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে হতো।শাসক শ্রেণী আমাদের কেবল স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে দেখেছে, কিন্তু আমরা ছিলাম পরিবর্তনের অংশ।নার্সদের অবদান কখনোই স্বীকৃতি পায়নি,কিন্তু আমরা জানি-আমাদের শ্রম ছাড়া হাসপাতালের একটা ও দিন চলত না।
আমরা টানা ১৫ দিন একসাথে নাইট ডিউটি করতাম।১২ ঘন্টা। সপ্তাহে একদিন ছুটি ছিল না। মাসে মাত্র নাইট অফ পেতাম তিনদিন।শারিরীক ও মানসিক ক্লান্তি ছিল আমাদের নিত্যকার সঙ্গী,তবু্ও আমরা কাজ করতাম,কারণ আমাদের মধ্যে একধরনের সম্পর্ক ও একাত্মতা ছিল।
আমাদের ছিল না অনেক কিছু কিন্তু প্রিন্সিপাল থেকে শুরু করে সুইপার সবার সাথে বন্ডিং ছিল ভালো, ছিল কাজের একাগ্রতা
শিলচর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রতিটি করিডোর প্রতিটি ওয়ার্ড নার্স হোস্টেল বয়েজ হোস্টেল সবই ছিল আমাদের জীবনের অংশ। ডাক্তারদের মধ্যে প্রেম ভালোবাসা ডাক্তার এবং নার্সের প্রেম এমনকি নার্সদের মধ্যেও বন্ধুত্বের টানাপোড়েন সবই ছিল হাসপাতালের নিত্যদিনের গল্প।
নার্স হোস্টেলের মালি রামযতন রবিদাস ড্রাইভার সিংদা, মক্কবীর আলির নাম নিতেই হয়। আলিদা ছিলেন হাসপাতালে জীবন্ত তথ্য ভান্ডার। প্রিন্সিপাল সুপার রেগে আছেন নাকি ভালো মেজাজে আছেন সেটা জানার জন্য সবাই আগে আলিদার কাছ থেকে খোঁজ নিত।
নান সিস্টারদের হেলপার মাসি আমিনা, যে নিজে না পড়তে জানলেও অনর্গল ইংরেজি বলতে পারতো,ভুলিনি তার কথা ও।
১৯৮৩ এ প্রিন্সিপাল স্যার ব্রজমোহন গোস্বামীকে পেয়েছি।নার্স হোস্টেলের যে কোনো প্রোগ্রামে নিমন্ত্রণ করলেই তিনি আসতেন। আরও অনেক প্রিন্সিপাল পেয়েছি,সুজিত কুমার নন্দী পুরকায়স্থ স্যার, দেবীদত্ত স্যার, অরুণ কুমার ভট্টাচার্য স্যার, পি সি বরুয়া স্যার, চক্কেশ্বর দাস স্যার, পি এ সাংমা ম্যাডাম, সঞ্জীব ধর স্যার, শিল্পী রাণী বর্মন ম্যাডাম, বাবুল বেজবরুয়া স্যার, ভাস্কর গুপ্ত স্যার।স্মৃতির যানজটে কিছু নাম ভুলে গেছি। আজকাল কাউকে নার্স হোস্টেলের প্রোগ্রামে তেমন দেখিনা।
ডাক্তারদের সাংস্কৃতিক প্রোগ্রামে নার্সদের যোগদান ছিল দেখার মতো।
ভুলবো না শিলচর মেডিকেল কলেজের সেই রঙীন দিনগুলোর কথা " সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি "। ২০১৮ এ কলেজের সুবর্ণ জয়ন্তীতে 'শ্রষ্ঠ নার্স ' সম্মাননা প্রদান করা হয়, এটা আমার জীবনের পরম পাওয়া।আমার সৌভাগ্য, শিলচর মেডিকেল কলেজের সুবর্ণ জয়ন্তীতে আমি executive কমিটিতে ছিলাম।
আমাদের এই গরীব দেশের মানুষদের জন্য, তাদের সুখ সুবিধার জন্য কিছু করাটা আমার আনন্দের।
বেঁচে থাকুক আমাদের স্বপ্নের মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বেঁচে থাকুক আমাদের সংগ্রাম। সাদা এপ্রন দেখলে আজও সমান রোমাঞ্চিত হই।
শ্রমের জয় হোক।
Comments
Post a Comment