জনতা কার্ফু


*********
অনামিকা আরো দশটা কমন নার্সের  মতো নয়, অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং দায়িত্ববান মেয়ে।
 20 মার্চ 2020 রাতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির 'জনতা কার্ফু ' ঘোষনা করার পর তার মাথায় যেন আকাশ ভেংগে  পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে নার্সিং হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে লিখে - ' কমরেডস এই ' জনতা কার্ফু' নার্সদের জন্য নয়। আমাদের নিজ নিজ কর্মস্থলে সময়মতো উপস্থিত থাকতে হবে।
 যুদ্ধকালীন তৎপরতায় আমাদের লড়তে হবে 'কোরোনা'র বিরুদ্ধে। বন্ধুগণ, আরো একবার ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল আমাদের পথ প্রদর্শককে স্মরণ করো। হোয়াটসঅ্যাপে চোখ রাখবে কিন্তু।

---- হ্যালো দিদি, যামিনী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে যে বাস পরিষেবা চালু করেছে, তা শুধু টাউন এর মধ্যে সীমাবদ্ধ। আমি কী করে ডিউটিতে আসি বলো।
---- যেভাবেই হোক আসতে হবে, না হলে সূইয়ের  নাভি দিয়ে কুড়াল ঢুকিয়ে দেবে। আইডি কার্ড গলায় বেঁধে, হাজবেন্ড কে বলো বাইক দিয়ে নিয়ে আসতে। পরে অথোরিটির সাথে কথা বলা যাবে।
----- গতকাল স্বর্ণ ঘাটের ঘটনার পর সিআরপিএফ জওয়ান উত্তেজিত হয়ে পড়েছে। আমার হাজব্যান্ড যখন আমাকে ছেড়ে ফিরে যাচ্ছিল তাকে আটকে খুব মেরেছে। ভালো লাগছে না দিদি।
             হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কানে কথাটি পৌঁছোয় অনামিকা। এত ব্যস্ত প্রিন্সিপাল, পাত্তাই দিলেন না।
    ----- তোমার আচানক ডিউটি! এক হাপ্তা থাকি তুমি একদিন ও ঘরে থাকো না, বাচ্চা দুইটার হাল্লত দেখো।
------ ইতা কিতা মাতোবা!  তুমি জানোনা নি আমি নার্স। নার্সের ডিউটি  কিতা। তোমার তানরে সরকারে  রেস্ট দিসে,  কপাল তোমারতান।  আমরার ছুটিছাটা বন্ধ করি স্টিমরোলার চালাইছে, খবর পাও নানি পত্রিকায়। তুমি একজন মাস্টার মানুষ বা!
 -----  চুপ করো, আর আমি তোমারে নিয়া দিতাম না ডিউটিতে। তোমার অথোরিটিরে কইও নিতো আইয়া।   আল্লাহ মাবুদ! তুমি আমারে নেও গিয়া।  আর যারিতে পারিয়ার না। প্রিন্সিপাল স্যাররে  ওতো বুঝাইয়া কইলাম, আমার জামাইরে একটা পাস দাও, না অইলে এই 21 দিন আমারে থাকার ব্যবস্থা করিয়া দেন। হোস্টেলে। কানে দিয়া তান হামাইলো না।   কিতা করতাম দো আল্লাহ!ও বিলকিস, তোর দাদি রে ফরাসর বিচি ওটাইন বার করিয়া দিতা কছাইন। কিতা রান্দিতাম!  রাইত রান্দিয়া  থইতে লাগবো। কাইল আগুইয়া আটিয়া ডিউটিত যাইমু।

         -----   হ্যালো অনামিকা দি, তোমার ওয়ার্ডে   সেনিটাইজার, মাক্স- ক্যাপ সাপ্লাই দিসে নি?
------ নারে, তিনদিন লেখার পরে মেডিকেল স্টোর থাকি মাত্র 20 টা ডিসপোজেবল মাক্স  দিছে। ইতা দুই দিনে শেষ।
--------- অত কোটি টাকা কিতাত খরচ করের  দ্যাখো, মেডিকেলো দের না আর  পি এইস সি, সি এইস সি  ইতায়  কিতা কতরা। দেউলিয়া প্রশাসন! 
--------শুন  নিরু, মাক্স বানাইলা। আমি আমার মেশিনো মাক্স বানাইয়া আমার ওয়ার্ড বয় সুইপার অতারে  দিছি। এক বোতল স্পিরিট রাখি দিস টেবিলো। ব্লিচিং পাউডার সাইডে ছিটাইয়া দে।  অতা করিয়া আমরা বাঁচা লাগবো। আমরার চিন্তা করার মানুষ নাই, কর্তাল বাজি পারইন।
      ----------- দাদা তোমার কবিতা চমৎকার হয়েছে, করোনার করণীয় সব ফুটে উঠেছে। আমার আর বাঁচতে ইচ্ছে করছে না।খালি অশান্তি।  ছেলেটা দিল্লি থেকে কলকাতায় এসে আটকে গেল...
        -------তোমার মত নির্ভীক এবং সাহসী মেয়েরা যদি এভাবে হতাশ হয়ে যায় তাহলে  কী হবে আমাদের দেশের, আমাদের সমাজের।  তোমাদের উপরই আমাদের ভরসা, এভাবে ভেঙ্গে পড়োনা। সময় বদলাবে সবকিছু আবার আগের মত হবে।
     -------কতদিন তোমাকে দেখিনি, তোমাদের প্রশংসায় প্রেরণা পাই, আরো কিছুদিন বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে।
      --------আচ্ছা বোন, মেডিকেলে কি PCR (polymerase chain reaction)     টেস্ট হয়?
    ------- মাইক্রোবায়োলজিতে কিছু একটা হয় দাদা, পিসিআর তো কোনো specific  টেস্ট না।  ভাইরাসের ডিএনএ স্টাডি মাত্র। তবে আমাদের এখানে কোন পজেটিভ কেস নাই। সাবধানে থেকো, ভালো থেকো, ভালো রেখো।


                  অনামিকার খুব ভোরে উঠার অভ্যাস। মোবাইল হাতে নিয়ে ফেসবুক টা খুলে-- মেঘদূত সেন লিখছে-- লকডাউন, প্রকৃতির ডাক ও কিছু কথা-- লকডাউন আমাদের গৃহবন্দি করে দিয়েছে --কোকিলের ডাক --পুকুর জলে লালচে সর-- কচি পাতার হলুদ রঙ --কাক, ঝিঝি পোঁকার ডাক --নিঝুম শহর --পড়ে ভাবুক হয়ে ওঠে তার মন। চোখ ছল ছল করে। একসময় নিজেও গল্প লিখতো।
          আবার ফোন ---অনামিকাদি শুনতে পাচ্ছো,  তোমার মোবাইলে কী বাজে শব্দ করছে।
    ------- আর বলিস না, মোবাইলটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে রে। ফোন কল ধরতে গেলে সুইচ অফ হয়ে যায়। কথায় আছে না--- পায়ে ধরতে গেলে ভাবে জুতা জোড়া চুরি করতে যাচ্ছি। অথোরিটির সাথে আমার আজ এই অবস্থা।  তোরা কেন আমাকে সম্পাদক করলে।
----- বাদ দাও তোমার বাজে কথা। একটা হাসির গল্প শোনো।সেদিন যখন হেলথ মিনিস্টার মেডিকেলে আসে, আমাদের সব OPDতে ব্লাড প্রেসার যন্ত্র আর সেনিটাইজার  দেওয়া হয়,  আজ সকালে সুপারিনটেনডেন্ট নিজে এসে এগুলো ফিরিয়ে নেন।চামচা একটাকে  বললাম স্যানিটাইজার টা রেখে দে, বলে এগুলো বিজ্ঞপ্তির জন্য। হাসিতে আমার পেট ফেটে যায়। কিচক?
 অনামিকা হাসতে পারে না। কি এক অশনি সংকেত শুনতে পায়। আলো-আঁধারি ডিউটি রুমের টেবিলে বসে সুন্দর ভাইরাসমুক্ত এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখে অনামিকা।


##               ##                  ##

Comments

Popular posts from this blog

শিলচর মেডিকেল কলেজ