খুঁচিধরা

খুঁচিধরা

আদিমা মজুমদার 
শিলচর 
সোনাই নদী পূর্ব দিকে গিয়ে যেখানে শেষ হয়েছে, সেখান থেকে আরম্ভ হয় ছোট গাঙ আমজুর। গাঙ্গের দুই পাড়ের সৌন্দর্য  দেখার মতো। সবুজ বনানী, বাঁশঝাড়,  মাদার গাছ।গাঙ এ দু-একটা ডিঙি  নৌকা বাধা। বেতাং ঝোপে  নানা রকম পাখির কুজন,  ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, শিয়ালের ডাক। একটা সজারু একদিন মেরে ফেলে গ্রামের লোক। এত মনোরম দৃশ্য যারা দেখছেন তারাই বলতে পারবেন, আর যারা দীর্ঘদিন ধরে এখানে বাস করছেন তারা সবচেয়ে ভালো উপলব্ধি করতে পারবেন। সেই আমজুরের পারে ছোট্ট একটি গ্রাম। কিশোরী মেয়ের মত। নাম তার ইছারপার। উত্তরে শরৎ এবং দক্ষিনে বিভূতি যেন।
                   সেই গ্রামের এক ব্যক্তি আসক আলী তার নাম। চাচাজি পুঁথি পড়তেন। শর্ট ফর্মে আমরা তাকে চাজি বলে ডাকতাম। প্রতি শীতের রাতে জমজমাট আড্ডা হতো আমাদের ঘরে। চাজি তামাক টানতেন। আমার দায়িত্ব ছিল তামাক ভরে দেওয়া। দুই একটা টান দিতাম সুযোগ বুঝে। চাজির বয়স পঞ্চাশের উপর।স্বাস্থ্য খুব  একটা ভালো নয়। হাঁপানির টান আছে।দুলাইন পড়ে একবার খকখক করে কাশেন,  আবার হুকাতে টান দেন। মুখের পানের পিক পিকদানিতে ফেলেন। মাগরিবের নামাজ পড়ে শুরু হয় পুঁথি  পড়া। এশার আজান শুনলে চলে যান মসজিদে, জামাতে নামাজ পড়তে। ফাঁকে ফাঁকে লাল চা খান।সংগে   কুকিশ বিস্কুট! কড় কড় শব্দ। আবার কাশেন, মুখের বিচ্ছুরিত ফোয়ারা আমাদের চোখ মুখ ভরিয়ে দেয়।😂😂😂 
ভদ্রলোক নিতান্তই ভালো মনের মানুষ। সহজ সরল। পৃথিবীর সব ভালো মানুষেরা মনে হয় সরলই থাকেন। 
ভাঙা খিড়কি  দিয়ে  বাতাস ঢুকে কখনো, লেম নিভিয়ে দেয়।  আমরা তখন' গেচ্ছে 'বলে চিৎকার করতাম। মা ধান ভানা ছেড়ে এসে লেম আবার জ্বালিয়ে দিতেন। চাঁদনী রাতে মা ঢেকিয়ালে ধান ভানতেন। চাঁদ অনেক দূর উঠে গেলেও মার  ধান ভানা শেষ হতো না। লেমের শিখা হেলে দুলে চাজির চোখেমুখে ঢুকে ডিস্টার্ব করতো। চাজি আবার কাশেন, পড়া বন্ধ করে এবার শুরু করেন খুঁচিধরার  গল্প।

মাটির বিছানায় আমরা সব তুতো ভাই বোন মিলে খুব মন দিয়ে শুনতাম। তখন মনে হয় আমি চতুর্থ বা পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ি। কার মুখে শোনা গল্প  চাজির মনে নেই। হাক দেন---'তোমরা সবাই ঘুমিয়ে গেলে নাকি?  কোরাসে বলে উঠি, না না চাচা। অথচ কেউ কেউ ঘুমিয়ে আলুথালু।
 সদরঘাট ব্রিজ হবে। নদীর খোয়াজ বাদশা কন্টাকটার এবং সর্বহারা এক মজদুর কে স্বপ্নে দেখিয়েছন, দুটো বাচ্চা লাগবে! ব্রিজ না হলে  সম্পূর্ণ হবে না। কোথায় পাওয়া যায় বাচ্চা! তাই তারা খুঁচিধরা ( ছেলেধরা)  পাঠিয়েছে গ্রামদেশে। খুঁচিধরার বীভৎস রূপ। মাথায় জট কালো কুৎসিত। পিঠে বড় ঝোলা ব্যাগ। ভেতরে ছুরি। বাচ্চা পেলেই ঝোলাতে ভরায়। এতটুকু বর্ণনা শুনে আমি, ও মাগো বলে ওঠে চাজিকে  জড়িয়ে ধরি। চাজি আমাকে কোলে নিয়ে বলেন- শুনো একদম বাইরে যেও না। সবাই মিলে দলবেঁধে স্কুলে যাবে। সাবধান, একা মোটেই নয়। মানুষ দেখলে খুঁচিধরা কুকুর-বিড়ালের রূপ নেয়।

             ভয় কাকে বলে এই শুরু হলো বুক ধড়পড়। আমাদের স্কুল যাবার রাস্তায় গাঙ্গের পারে একখানা কবরস্থান। সেখানে ভূত ফেরত ফিরিস্থার  আনাগোনা। চোখ বুজে এই জায়গাটা দৌড়ে পার হতাম। চোখ বুঝা এই কারণে, ভুত প্রেত দেখলাম না। যদি আশেপাশে থেকেই থাকে।
                আমাদের ঘরের ভেতরে বাথরুম ছিলনা। কাঁচা পায়খানা, পেচ্ছাব খানা  দূরে পেছনের বাঁশঝাড়ের মাঝখানে।  সুপুরি খুলের বেড়া।  রাত্রে পেচ্ছাপ করতাম দক্ষিণের বারান্দায়। শেষ না হতেই উঠে যেতাম, টের পেতাম পা  কে ধরে ফেলেছে। ভারি হয়ে যেতো পা।  কোনরকমে ভাই-বোন কে কার আগে ঘরে ঢুকতে পারে তারই লড়াই। 
অন্ধকারে  মরা কলাগাছের বাগু নড়লে দেখতে পেতাম খুঁচিধরা খাপ মেরে বসে আছে।  গাছের ডালে বসে রয়েছে।  কতদিন দেখেছি।
একদিন আমি ও আমার দাদা স্কুল থেকে ফিরছি, কবরস্থানের সামনে দেখি একটা কালো কুকুর! আমরা ইএনডি বাঁধ দিয়ে যাচ্ছিলাম,  দাদা বললো, খুঁচিধরা কুকুরের রূপ ধরেছে! চল,  দে দৌড়।  স্পিড দেখুন। আমাদের নাগাল পায়নি কুকুর।  হাঁপাতে হাঁপাতে ঘরে ঢুকি। বই কোনদিকে চুড়ে ফেলি খেয়াল নেই। মা--আ  বলে বুকফাটা  চিৎকার করেছিলাম, আর কিছু বলতে পারি না।😥😥😥

       হুস  যখন হয় দেখি দাদি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন, বলছেন কলারতল থেকে দুটো বাচ্চা ধরে নিয়ে গেছে খুঁচিধরা। মা বাবা স্বেচ্ছায় তাদের হাওয়ালা করে দিয়েছেন বাচ্চা, কারণ এরা কথা শুনেনা, খুব দুষ্টু। ব্রিজের কাজে আর নতুন বাচ্চা লাগবে না। তোমাদের আর ভয় নেই।❤❤❤
 না। আমার ঘাড় থেকে খুঁচিধরার ভয় নামেনি। আর সে- ছবি মনে করতে পারবোনা। ভয় হয়।😳😳😳


##             ##              ##

Comments

Popular posts from this blog

শিলচর মেডিকেল কলেজ