এমনেশিয়া /আলঝাইমার্স
আমাদের বাড়ির সব মেম্বার সিপিএম সাপোর্টার। কংগ্রেস, জনতা পার্টি, সমাজবাদী পার্টি, জনতা দল, লোকদল এসব নাম শুনেছি। বিজেপি একটা পার্টি কোনদিন নাম শুনিনি। আজ থেকে পঞ্চাশ ষাট বছর আগের কথা বলছি। গ্রামে গ্রামে তখন ভারতবর্ষের প্রথম প্রধানমন্ত্রী চলচ্চিত্র জীবনী দেখানো হতো, মস্ত বড় পর্দায়, প্রজেক্টর দিয়ে।
আমজুরঘাট বাবার স্টেশনারি দোকান। বিরাট বড় মক্কার তেঁতুল গাছের নিচে। তেমাথায়। একটা রাস্তা গেছে ইছারপার আর একটা স্বাধীন বাজারে এসে পরাধীন হয়েছে। স্বাধীন শব্দ টা কি সুন্দর! আমাকে ভাবায়। বাবা খুব সহজ-সরল মানুষ ছিলেন। পৃথিবীর সব ভালো মানুষেরা মনে হয় সরলই থাকেন।
মা নিতান্তই গৃহবধূ। স্কুলের বারান্দায় পা রাখেন নি।
বাবার চাচি, -মায়ের মাসি।
মা, মাসির বাড়িতে বেড়াতে এসে বাবার সাথে পরিচয়।
মস্ত বড় উঠোনে খেলার সাথী বাবা। প্রেম। বিয়ে।
তেরো বছর বয়সে মার বিয়ে হয়।
সেমিজ এবং কালো গামছা পরতেন।
মায়ের মাসি বাবার চাচিকে আমরা নানিবুদি ডাকতাম।
গ্রামের কিছু লোক মা-কে ইন্দিরা গান্ধী উপাধি দিতেন মাঝে মাঝে।স্কুল না পড়েও নিজের ছেলে মেয়ে, গ্রামের ছেলে মেয়ে সবাইকে পড়া সম্বন্ধে লেকচার দিতেন। স্বশিক্ষিত।মায়ের যে মেধা ছিল অনায়াসে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে পারতেন। কিন্তু যাপনের দৌঁড়ে ও গ্রামের গ্যাঁড়াকলে পুঁথিগত শিক্ষা হয় নি ।
শীতের রাতে গ্রামের প্রত্যেকের ঘরে পালা করে মিলাদ শরীফ পাঠ হতো। আমাদের ঘরে চাঁদনী রাতে উঠোনে গাজীর গান, গাট্টার গান, কবিগান, লোকগীতির আসর বসতো। আম্মি রান্না ঘরে গানের সুরে গলা মেলাতেন । দর্শক-শ্রোতাদের মা বন রুটি দুধ চা খাওয়াতেন।পার্টিকে মাংস ভাত। ঘরে পোষা মুরগির মাংস।
ক্রিকেট দেখতে আমাদের ঘরের ভিড় চোখে দেখার মতো। গ্রামে প্রথম টিভি আমাদের ঘরে আসে ১৯৮৫, সে কি আনন্দ! মা বসার সুবিধার জন্য তক্তা দিয়ে লোহা মেরে খাট, মুর্তা বেতের ছোট ছোট ছাঁটাই বানাতেন। দিনের কাজের চাপে খেলা দেখতে পারতেন না, হাইলাইট দেখতেন।
বাবা দোকান নিয়ে ব্যস্ত। মাঝেমধ্যে ঘরে আসতেন। বাবাকে টিফিন নিয়ে দিতাম ভাই বোন মিলে। আমি কিছু সময় দোকানদারি ও করতাম। আমাদের খেতের প্রচুর জমি ছিল।মা এদিক সামলাতেন সিদ্ধহস্তে। কোনখানে কোন বিসড়ায় হালিচারা ফেলবেন, কোনখানে বিরইন কালিঝিরা, সাইবাইল, আই আর এইট, রঞ্জিত, বরুয়া ক্ষেত হবে মা ই বলে দিতেন, কাজের লোককে।আটটি ছেলে মেয়েকে মানুষ করেছেন আমার সর্বংসহা মা। অভাব বুঝতে দিতেন না। কাজ করেছেন নিরলসভাবে । বিনা অজুহাতে ।
মা ছিলেন জমিদারের মেয়ে। উনার বাবার বারোটা হাতি ছিল। মানে আমার নানা বিরাট সৌখিন পুরুষ ছিলেন। মা-বাবাকে মাঝেমাঝে কথা শুনাতেন' ছোটলোক' । শব্দটি আমি নিজের কানে শুনেছি। অর্থ বুঝতাম না । তবে মাড়া ঝাড় দিতে আসা দেশোয়ালি মেয়েদের জন্য মায়ের আলাদা দরদ ছিল। ন্যায্য ধান চাল দেবার পরও পান-সুপারি পিয়াজ রসুন তেল দিতেন, সঙ্গে আমাদের পুরনো কাপড় যেগুলো যথেষ্ট ভালো থাকতো সেগুলোও দিতেন।
আমার ছোট চাচা মাকে শেখ হাসিনা ডাকতেন। মায়ের মুখের আদল ছিল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মতোই কিছুটা। মা খুব খুশি হতেন। গ্রামের লোকরা মা-ছোটো চাচাকে নিয়ে নানা গাল গল্প সাজাতো । নির্ভয়ী মা আমার এসব কথায় দমে যাওয়ার পাত্রী ছিলেন না ।
মায়ের একটু অহংকারও ছিল। পুরনো বাড়ি থেকে বাবা বেরিয়ে এসেছিলেন নতুন বাড়ি কাটিয়ে, তো দিঘি যাওয়ার রাস্তা বর্ষায় কর্দমাক্ত হয়ে যেতো, আমাদের উঠান মাড়িয়ে পুরনো বাড়ির লোক দিঘিতে যেতেন। আম্মি খুব একটা পছন্দ করতেন না ।
গ্রামের যত বড় বড় অনুষ্ঠান বিয়ে হোক বা সালিশি, বা মেয়ের বাড়িতে পিঠা দেওয়া, সব কাজেই মা ছিলেন কুশলী মহিলা ।
মা অনেক পশুপাখি পালতেন- পায়রা হাঁস-মুরগি গরু-ছাগল মহিষ। তারা মায়ের সাথে কথা বলতে দেখেছি। আকাশে মেঘ করতে দেখলে ছাগল দল বেঁধে দৌড়ে বাড়িতে আসতো। গরু-ছাগলের নাম রাখতেন। সোহাগ করে আদরও দিতেন ।
মা আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। কেউ কিছু বললে মাকে বলে রাখতাম। দিদি কবি গান গাইতো মাও গলা মেলাতেন। বিকালবেলা আটচালায় বসে বাতাস খেতে খেতে গল্প পাঠ হতো। বড়দা পাঠ করতেন, মা আমি ছোট ভাই বোন সবাই শ্রোতা।
মা বিড়ি টানতেন।একদিন পিসি আমাকে কথা শুনায় - 'তোর মা বিড়ি খায়'
মা কথাটি শুনে বলেছিলেন -বিড়ি না টানলে তোমাদের সাথে ঘর করা সম্ভব ছিল না।
কলেজ শেষ করে আমি চলে যাই ট্রেনিং এ। চাকুরী হয় । তারপর বিয়ের বেড়াজালে আবদ্ধ হই। একে একে ছেলে মেয়ে। শ্বশুরবাড়ির নির্যাতনের কথা মাকে বলতাম না। মা বুঝতে পারতেন। বলতেন- 'হারামির দল আমার বোকা মেয়েকে শেষ করে দিচ্ছে। নেমকহারাম।'
বাবা চলে যাবার পর অদ্ভুতভাবে শান্ত হয়ে যান মা। ফজরের নামাজ দুই-তিনবার পড়তেন মাগরিবের নামাজ ও। ভাবতাম এক্সট্রা পূণ্য আদায় করছেন। পাড়ার মানুষের মুখের দিকে চেয়ে শুধু মিষ্টি হাসতেন। দিঘিতে বড়শি নিয়ে বসে থাকতেন। আমি হাঁটি আর হাঁটি মায়ের যন্ত্রণার গভীরে । ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে হয় । কিন্তু পৌঁছাতে পারি না ।
ভাত রেঁধে বারান্দায় বেরিয়ে আমাদের ডাকতেন। এসো হে, ভাত হয়ে গেছে। তারপর নিজের মনেই বিড়বিড় করতেন 'কত কাজ বাকি'
পৃথিবীর কোন জিনিসে আজ আর মার আকর্ষণ নেই। সুপুরি গাছের তলা ঝাড়ু দেওয়া, মাদার গাছের পরগাছা বাছা, কচু গাছ কাটা, কলমি হেলেঞ্চা শাঁক কেটে রাখা, বাড়ি সুন্দর করাই কাজ।নিজের চামড়ার জুতো জোড়ার প্রতি খুব দুর্বলতা, কোথায় যে লুকিয়ে রাখেন -খুঁজতে খুঁজতে পাওয়া যায় না। পুরোনো কিছু কথা স্মৃতিতে আছে কিন্তু বর্তমান কিছুই মনে নেই।
মাকে একটু সুখ দেবো । সুখ মানেই তো দুঃখের সাথে লড়াই করা।
নিমহানস -ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ মেন্টাল হেলথ এন্ড নিউরো সাইন্স, বেঙ্গালুরুতে আমি in country fellowship (NIMHANS) ট্রেনিংয়ে যাই... স্যাররা যখন ক্লাস নিতেন, আমি মায়ের sign symptoms এর সাথে মিলাতাম। এ্যমনেশিয়া /আলঝাইমার মানে ভুলে যাওয়া রোগ।এই রোগ বুঝতে বুঝতে দেরি হয়ে যায়, তখন আর কোনো চিকিৎসা কাজে লাগে না।
ট্রেনিং থেকে এসে মাকে একদিন দেখতে যাই। আমাকে দেখে মুচকি হেসে গালে চুমু খেয়ে বলেন,
' ভালো আছো বোন 'কতদিন পর তোমাকে দেখলাম।' মা আমাকে চিনলেন না... জীবনের এই দিনটাকে মেনে নেওয়া আমার পক্ষে অসম্ভব ছিল। মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে মরাকান্না কাঁদছিলাম সেদিন। মা শুধু তাকিয়েছিল আমার মুখের দিকে । মায়ের সেই উক্তি আজও আমার কানে বাজে । রাতের ঘুম কেড়ে নেয় ।পৃথিবীর সবকিছু ভুলে গেলে মা আমাকে ভুলতে পারবেন না। ভুলতে দেবোই না। ডাক্তার দেখাই। ট্রাংকুলাইজার ছাড়া কিছুই দেননি। ট্রেনিংএ আমাদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়, রিহ্যাবিলিটেশন এর কথা।
এ্যমনেশিয়া রোগীর অ্যাটেনডেন্সকে কাউন্সেলিং দেওয়া হয়। রোগীকে কিছু বলা হয় না, কারন বলে লাভ নেই। সময় মতো স্নান ভাত খাওয়া ঘুম পাড়ানো সব দায়িত্ব যারা দেখা শুনা করবে তাদের।
ভাই বোন সবার বিয়ে হয়ে যায়। সব আলাদা হয়ে যান। নিজের ফ্যামিলি নিয়ে নিজের স্বার্থ নিয়ে। ছোট ভাইটির সাথে থাকেন মা। সে ই শেষ জীবনে মায়ের একমাত্র সম্বল ছিল। গু মুত কেড়েছে।ভাই বলে,
' দিদি যতসব সব্জী মাছ ঘরে এনে রাখি, মা সব রান্না করে নেন। একটা রান্না করার পর যদি আমি বলি আর না মা, তখন বন্ধ করেন। ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে, আবার শুরু করেন। দিদি, মা আমাকে ভাই বলেন। আমি আর পারিনা সহ্য করতে '।
কিসের বেদনা ভালো করে বুঝতে পারিনা, বেদনার উপর হাঁটি। মনে হয় সারা দুনিয়া অন্তঃসার শূন্য। আমি ছুটছি একা অজানা গহীনে ।
ডিউটি বাচ্চাদের পড়াশোনায় অস্থির হয়ে উঠি। কয়েকদিন আমার সাথে রাখলাম মাকে। ঘুমের সময় পায়ের উপর পা তুলে যখন গল্প করতাম, মা মেয়ে হারিয়ে যেতাম এক স্বপ্নরাজ্যে। সুন্দর গল্প করতেন। ঘরের ছাদের দিকে চেয়ে একদিন মা বলছেন, কি সুন্দর করে ওই কোনটা বেঁধেছে দেখো, আসল শিল্পী এরা। এত সুন্দর করে কথা বলতেন, কিন্তু পায়খানা করতেন না বাথরুমে। বাড়ির পায়খানা ছিল বাঁশঝাড়ের নিচে। আমার বাড়ির পেছনে জায়গা নেই। পাঁচ কাঠা জমির উপর আমার বসবাস। রাতে গ্রিলের ভিতরে পায়খানা করে বস্তা দিয়ে ঢেকে রাখতেন। আমি পরিস্কার করি কাঁদি আর বলি- পাগল নয় ভায়োলেন্ট ও হন না, এ কি করেন। মায়ের এসব আচরণ আমার বুকে দুঃখের হিমালয় গড়ে। আমার স্মার্ট মায়ের আজ কেন এই অবস্থা!
বাচ্চা স্কুলে যাবে জুতো মোজা খুঁজে পাইনা। বিছানা করার সময় দেখি বালিশের নিচে লুকিয়ে রাখছেন। মাকে দেখতে আসা আত্মীয়রা আপেল আঙ্গুর আনতেন, মা লুকিয়ে রাখতেন। পচা গন্ধ বের হলে খুঁজে পেতাম। কাপড়-চোপড় শুধু টুবলা বাঁধতেন।
ট্যাবলেট খেয়ে কোনরকম এক ঘন্টা ঘুম। তারপর পায়চারি। 'স্কুলে যাবে, খাবে, অনেক কাজ পড়ে রয়েছে'। এইটুকু বকা।
আমার খুব অসুবিধা হয় মাকে নিয়ে। দুঃখের পাহাড় সহ্য করতে পারি না । দুশ্চিন্তা আর আর্থিক চাপে আমি সুইসাইড করার ফঁন্দি খুঁজি। দাদারা মায়ের এই অবস্থা মেনে নিতে চায় না। আমরা আট ভাই-বোন,কাজের লোক নিয়ে বিরাট বড় পরিবার ছিলাম। কিন্তু আজ মা বড্ড একা। একাকীত্ব এবং নিঃসঙ্গতাই এই রোগের কারণ। মানুষ একা বাঁচতে পারে না। মানুষকে সচেতন করাই হচ্ছে রোগের ট্রিটমেন্ট। এই রোগ সারে না, এসব রোগীকে আলাদা রেখে সেবা করতে হয়। যারা সেবা করেন তাদের কাউন্সেলিং দেয় ডাক্তার।
মাথায় আমার আজকাল কাজ করে না। ডিউটিতে গিয়ে বন্ধুদের সাথে মায়ের কথা শেয়ার করি। এক বান্ধবী বলে তার মায়ের একই অবস্থা আরো কয়েকজন বলে তাদের কারো বাবার কারো পিসির, শেষ বয়সে নিশ্চুপ হয়ে যান। বন্ধুরা বলে আমাদের জন্য মা রা অনেক কিছু করেছেন। শেষ বেলায় তারা কিছুই ফিরে পাচ্ছেন না, তাই ভুলে গেছেন। ভালো হয়েছে মনে থাকলে বেশি দুঃখ পেতেন।
সময়মতো না খেয়ে মায়ের শরীর দিন দিন কমজোর হতে থাকে। সবাই নিজের ক্যারিয়ার বউ-বাচ্চা নিয়ে ব্যস্ত। ছোট ভাইকে বিয়ে করাই। আমার ব্যস্ত মা সময়ের টানাপোড়েনে হেরে যান । ক্ষণস্থায়ী ঠিকানা হয় বিছানা। খুব কম দিন বিছানার সাথে চলে তার যুদ্ধ । সব যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে ২০০৮ সালের ৯ জানুয়ারি মা চলে যান না ফেরার দেশে।
" This is the way the world ends
Not with a bang, but a whimper "
বাঁশঝাড়ের পর মাঠ। মাঠের উপর আকাশ। আকাশের পর মেঘেদের রাজ্য । মেঘ-আকাশের মাঝখানে আমি মাকে খুঁজি । বৃষ্টির ফোঁটায় আম্মির স্পর্শ পাই । মনে আছে যাবার বেলা আম্মি আমার কানে কানে বলেছিলেন...কী? কিছুই মনে করতে পারছি না।
## ## ##
Comments
Post a Comment