শারদ সুজন
মানুষের বোধ মননে চিন্তনে চলছে দ্রোহকাল।গোটা বিশ্ব অতিমারীর কবলে। এমনি সময়ে এমন একটি সুন্দর ভাবনা "শারদ সুজন "নিয়ে কলম ধরতে আহবান জানানো হয় আমাদের। কবি সংগঠক বন্ধু বিদ্যুৎ চক্রবর্তী স্নেহভাজন রূপরাজ ভট্টাচার্য পুত্রসম তরুণ বিপ্লবী মেঘদূত সেন। তোমাদের আমার অকৃত্রিম ভালোবাসা ও সংগ্রামী অভিনন্দন। তিনদিনে তিনজন শিল্প সাহিত্য -সংস্কৃতি তথা সামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত নীরব ও নিরলস কাজ করে যাওয়া ভালোবাসার মানুষের কথা বলব, তাই তো। কত মানুষ যে আমার স্মৃতিপটে ভেসে বেড়াচ্ছে।
" হালিচারা "গল্প সংকলন এর লেখিকা মঞ্জুরি হীরামনি রায় আমার প্রিয় গল্পকার, বন্ধু সুজন। আমার ভালোলাগা মানুষ। বরাক উপত্যকা নন্দিনী সাহিত্য ও পাঠচক্রের ত্রৈমাসিক অণু পত্রিকা 'বরাক নন্দিনীর' সম্পাদক। সবাই এক ডাকে তাঁকে চেনে। শুধু কি তাই, নিরলস কাজ করে যাচ্ছে কিন্তু প্রচারবিমুখ। তাকে নিয়ে সময়ে লিখবো।
এই পর্যায়ে আজ আমার তৃতীয় এবং শেষ দিন। আসলে আমার কাছে খারাপ মানুষ খুব কম। সবার মধ্যে আমি ভালো গুণ বেশি দেখতে পাই। আজ আমি যার কথা বলব তিনি মানুষ বানানোর কারিগর। প্রাইমারি স্কুল শিক্ষক। প্রয়াত তুরপান আলী লস্কর। বাড়ি কাছাড় জেলার বিদ্রোহীপার গ্রামে। সম্পর্কে আমার জামাইবাবু। ভাইসাব বলে সম্মোধন করি। এমন একজন মানুষ যিনি আজীবন সমাজের কাজ করে গেছেন।নীরবে নিস্তব্ধে। তার সুযোগ্য পুত্র আব্দুল মতিন লস্কর সোনাই মাধব চন্দ্র দাস কলেজের বিভাগীয় অধ্যাপক।
ভাইসাহেব আমার জীবনে এক ফেরেস্তা। হায়ার সেকেন্ডারি পাস করার পর ঘরে ফয়সালা হলো আমাকে আর পড়াবেন না। এতগুলো ভাই-বোন সবাই পড়ছে, বিভিন্ন শ্রেণীতে। পড়াশুনার খরচ বাবার পক্ষে আর দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আমি কাঁদতে আরম্ভ করি পড়ার জন্য, সেদিন ভাইসাহেব বলেছিলেন চিন্তা করিস না আমি তোকে পড়াবো এবং পড়িয়েছেন, নার্সিং ট্রেইনিং এ খরচ দিয়েছেন।
দাদা বদর এভাবে ফিজিক্যাল ইন্সট্রাক্টর কোর্স করতে গিয়েছিল তামিলনাডু, মাদ্রাজ। ট্রেইনিং শেষে ফিরে আসার সময় নেলি গহপুর হত্যাকাণ্ড ১৯৮৩ মুসলিম নিধন চলছে, ট্রেন আটকে মানুষ খুন করা হচ্ছে আসামে। এহেন বিপর্যয়ের সময় পাশে এসে দাঁড়াতে দেখেছি ভাইসাবকে। তাকে উড়ে আসতে হল। এ কথা ভুলে গেলে মনুষ্যত্বের অবমাননা করা হবে। ভাইসাব শুধু আমাদের জন্য নয়, গ্রামের যে কোন মানুষ বিপদে পড়লে এগিয়ে যেতেন তিনি। স্বামী স্ত্রী ঝগড়া করলে তিনি হাসিয়ে কথাটা হালকা করে দিতেন, বলতেন 'এমন আপন জনের সাথে ঝগড়া হবে নাতো বাহিরের লোকের সাথে হবে নাকি'। ঘরের চাল ডাল অকাতরে বিলিয়ে দিতেন গরিবদের। এমনকি বাজার থেকে মাছ সবজি পর্যন্ত রাস্তা দিয়ে আসতে দিয়ে আসতেন।
দিদি ভাইসাবকে' হাতেমতাই 'বলে ডাকতেন। আমার দিদি ও তেমনই দরদি। ছোট ছেলের চাকরি হওয়ার পর দিদি বলে দিয়েছেন, একশো শাড়ি আমাকে এনে দেবে, 'ফকির বেটিনতরে দিতাম '-এমনই ভালো মনের মানুষ দুজন। দিদির কত শাড়ি পরেছি। নতুন শাড়ি কিনলে আমি নিয়ে আসতাম, কলেজে যাবার জন্য।
বিদ্রোহী পার গেলে আমার ভালো লাগতো না। ভাইসাহেব সবসময় প্রশ্ন করতেন। বলতেন, 'বলতো আর্কিমিডিসের সূত্র, এইম ইন লাইফ রচনা শিখা হয়েছে? কলম খাতা নিয়ে পড়তে বস। শুধু পড়া আর পড়া। আমাকে নয় হাটে ঘাটে মাঠে যাকে পেতেন -কোন ক্লাসে পড়ো জিজ্ঞেস করে শুরু হয়ে যেতো প্রশ্ন। কত বাচ্চাকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে সাহায্য করেছেন। ভাই সাহেবের দুই দাদা বৌদি অকালে মারা যাবার পর ছোট ছোট বাচ্চাদের লালন-পালন করে পড়াশোনা করিয়ে, বিয়ে-শাদী পর্যন্ত দিয়েছেন। তাদের মুখে 'বাবু' ডাক শুনলে আমার তাদের ছোটবেলার কথা মনে পড়ে যায়। একজন সাধারণ শিক্ষক কতটি পরিবার টেনেছেন। সমাজের কত কাজ করেছেন। সত্যিই এদের নাম কেউ জানলো না। 'নাম না জানা কত ফুলই পথের ধারে ফোটে
জীবনটা যায় ঝরে ঝরে ফুলদানি না জুটে...। '
জামাইবাবু বলে ঢং তামাশা কোনোদিন করিনি। ভীষণ শ্রদ্ধা করতাম।লেখাপড়া না শিখলে সমাজ এগিয়ে যেতে পারে না এটাই ছিল তাঁর মূল মন্ত্র।
২০১১সালের পনেরোই আগষ্ট ৬৫ বছর বয়সে তিনি চলে যান না ফেরার দেশে। তোমার মত মানুষের আজ খুব দরকার ছিল ভাইসাব। যেখানেই থাকো বেহেশতের ছায়া শীতল কক্ষে তোমার স্থান হবে। আমার শতকোটি সালাম।
# ছোট বোনের জীবনসংগী ভাইসাবকে নিয়ে একটি কবিতা লিখেছিল, এখানে দিলাম।#
আগামী তিনদিনে তিনজনের কথা বলার জন্য আমি ডেকে নিচ্ছি আমার অতি প্রিয় মানুষ শিখা রায়কে।
# # #
Comments
Post a Comment