মা,সীমা ঘোষ। 'যে রাতে মোর দুয়ার খুলি...' সীমা ঘোষ /শিলচররাত বেশ। মা রান্না ঘরে টুকটাক । কাজ চলছেই। মা তো ! আজব জীব এরা। যুগে যুগে অলিখিত সীমাহীন দায়িত্ব ও কর্তব্যের পরোয়ানা নিয়ে চলে । মেয়ের বাড়িতেও তা থামে না। হয়তো কালকে নাতির টিফিনের কিছু রেডি করে রাখছে। ড্রইং রুমের মেঝেতে পাতা বিছানায় মেয়ে ভাইকে নিয়ে পড়া শেষে ঘুমের দেশে । আমার বিছানায় বাবা তুমুল নাক ডেকে নিশ্চিন্ত।রান্নাঘরে যা টুংটাং , মনে হচ্ছে , মায়ের আরও কিছু সময় লাগবে, আমি বরং মায়ের বিছানাটা এইসময় রেডি করে ফেলি। ঝেড়েঝুড়ে চাদর টেনেটুনে দিই, মাথার বালিশের পাশে ছোট টর্চও একটা রেখে দিই। টেবিলে এক বোতল জল, মশারিও টাঙাই ।এক চতুর্থাংশ টাঙিয়েই আলস্য ভিড় করে । চার নম্বর কোনার রশি হাতেই বিছানায় লুটিয়ে পড়ি। তবে, মনে রয়ে যায় মা রান্না ঘরে। সুতরাং ঘুম ওই চিড়িং চিংড়ি, মাঝে মাঝে খুলে খুলে যায় । দেখি চাবি নিয়ে মা দরজা খুলে বাইরে যাচ্ছে। ফিরে এসে আমার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে সন্তর্পণে আমার ঘুমের গভীরতা মাপে । হাত থেকে চুপিচুপি রশি ছাড়িয়ে নেয় ।চড়াৎ করে উঠে পড়ে বলি,' মা তুমি কোথায় গিয়েছিলে ? 'ঐ তো সিঁড়ির গ্রিলে চাবি দিয়ে এলাম। 'আমি : ওটা আবার কষ্ট করে করতে গেলে কেন?মা : তোরা দেখছি প্রতিদিন এভাবে গেটে তালাটা না দিয়ে শুয়ে পড়ছিস। গতবার এসে কত করে বলে গেলাম এ ভাবে ঝূঁকি নেওয়া ঠিক নয় ।আমি: এ বিল্ডিংয়ে জব্বর একটা শাটার লাগানো।আর তা ছাড়া ভূমিকম্প হলে এতো গেট খোলার সময় পাব ?মা : কবে ভূমিকম্প হবে ভেবে গ্রিলে চাবি দিবি না ?আমি : আচ্ছা আচ্ছা এবার থেকে দেব। মা, আর না রাত অনেক হলো । তুমি শুয়ে পড়ো ।'মা: দেখ একটা কথা বলি। ছেলেমেয়েদের আর মেঝেতে ঘুমোতে দিস না ।আমি ; তাহলে তুমি কোথায় শোবে ?মা: ঐ তো তোর বাবার বিছানায় এক পাশে শুয়ে যাব।আমি: বাবার নাসিকার তর্জনগর্জনে তোমার ঘুম হবে ?মা : হবে হবে ।মা : তুমি একদম ভেবো না । ওরা মেঝেয় শোয়া খুব এনজয় করে।মা : কী যে বলিস ! 'এনজয় করে 'আমি: হ্যাঁ গো ! একবার কোন এক বিয়ে বাড়িতে বেশ কয়েকজন প্রায় সমবয়সী মিলে মেঝেতে বিছানা পেতে শুয়েছিল। ভোরের আলো ফোটার অনেক আগেই ঘুম ছেড়ে অনেক গল্প গুজব হাহা হোহো । সেই থেকে ওরা মেঝেয় ঘুমোতে খুব মজা পায় । আমায় তো প্রায়ই মেঝেয় বিছানা করে দেওয়ার আবদার করে।' যে কদিন আছো আরাম করে ঘুমোও তো !আমি বিছানা থেকে নেমে আসি। হঠাৎ পায়ের তলায় পৃথিবী কি একটু দোল খায়। আমি তো পাশের ঘরের ছেলের পড়ার ঘরে নেই ! নিজেকে আমার বিছানাতেই আবিষ্কার করি । ওদিকে দেয়ালের দিকে মুখ করে ছেলে ঘুমিয়ে আছে। তাহলে বাবা যে এঘরেই ঘুমিয়েছিল ? ডাইনিং টেবিলের পাশের সূইচ বোর্ডে হাত দিই আলো জ্বালাই ।তাড়াতাড়ি পাশের ঘরে যাই । বিছানা টানটান করে ছেলে গুছিয়ে রেখেছে। লকডাউন এফেক্ট।ড্রয়িং রুমে যাই । যেমনকার তেমন । কোথাও কিছু নেই। মেঝেতে সোফা টি টেবিল , ও পাশে পড়ে আছে খালি জলের বোতল।জল খেয়ে ডাইনিং টেবিলের একটা চেয়ার টেনে বসি। তাহলে মা-বাবা ? ধীরে ধীরে আমার সম্বিত ফিরে আসে।সে তো আজ থেকে দশ বছর আগে চার মাসের ব্যবধানে সবাইকে অবাক করে পৃথিবী থেকে ....।না এখানে বসে দম বন্ধ লাগছে।বারান্দার দরজা খুলে বাইরে ব্যালকনিতে দাঁড়াই।শিলচরের শুনশান রাতে হসপিটাল রোড একা চিৎ হয়ে শুয়ে শুয়ে রাতের তারা গুণছে। ঐ পাড়ে বন্ধ দোকানের সামনে প্রতিদিন সকালে যে মেয়েটি চার পাঁচটা প্লাস্টিক ব্যাগ নিয়ে এসে বসে খুব পরিপাটি করে, এই রাতে দু চোখ ওকে খুঁজে চলে । কিন্তু ও তো সন্ধে হলেই বাড়ি চলে যায় । আচ্ছা, ওর কি সত্যি বাড়ি আছে ? কেউ আছে নাকি ওর বাড়িতে ? পোঁটলা থেকে বের করে খাবার খেতে দেখি। এসব তাহলে কোথায় পায় ? ওকে আজ রাতেই যেন বুঝে নিতে চাই। লকডাউন থেকে ওর ওখানে আস্তানা।আগে কোথায় থাকতো জানিনা। সত্যি আমার ওকে আজও জানা হয় না।আকাশের তারা দেখি। সেই তারা যে সন্ধেয় ওঠে আর হেঁটে হেঁটে একদিক থেকে আরেকদিকে চলে যায় ? আজ এখন যেখানে এসেছে , চাঁদ ওর থেকে বিঘৎ খনেক দূরে দাঁড়িয়ে। একটু নিষ্ঠুর কর্কশ লাগলো চাঁদটাকে। যেন ইচ্ছে করে তারার থেকে মুখ ফিরিয়ে আছে।ঘরে আবার ফিরে ঐ বিছানায় বসি । যে বিছানা আমি মায়ের শোয়ার জন্য রেডি করতে করতে মশারির একটা দড়ি হাতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। কিচ্ছু নেই সেখানে ।ছেলে পরিপিটি করে গুছিয়ে রেখেছে। বিছানার চাদরে হাত বোলাই । একটা সাদামাটা শাড়ি পরা মা আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। ছোটো একটা কুশল জিজ্ঞাসাতেই বুকে যেন কথার ঢেউ তুলে দেয় । কত না- বলা কথা হৃদয় ভেদ করে উঠে আসতে চায় । ভীত সন্ত্রস্ত চির রহ দরিদ্র মার কোনো কথা বলা হয় না। একটা নির্বাক নিস্পন্দ মূর্তির চোখে গাঢ় বেদনার ভার লেগে থাকে । ঠোঁট নড়ে না। একটা অদৃশ্য শাসনের চাবুক হাতে কঠোর চোখে দাঁড়িয়ে থাকে কেউ মার সামনে । হঠাৎ মায়ের জায়গায় রম দেখতে পাই দেওয়াল থেকে ক্রুশবিদ্ধ যিশু এসে দাঁড়িয়েছে। পেরেক বিদ্ধ যিশুর করুণ চোখে কী লেখা পড়তে চেষ্টা করি । যিশুর সারা গা বেয়ে গড়িয়ে পড়তে থাকে রক্ত। এ নিষ্ঠুর অত্যাচারের যন্ত্রণায় তবু কুঁকড়ে ওঠে না তার মুখ। চোখ অদ্ভূত রকমের শান্ত। সে তাকিয়ে আছে আমার দিকে।হাত বাড়িয়ে দিতেই সে মা হয়ে যায় । মাও বলিরেখা আঁকা ডান হাতটা বাড়িয়ে একটু ছুঁতে চায়, কিছুই বলা হবে না কোনোদিন এ কথা জেনেও। তবু হাতে হাতে কথা যদি হয় ! সিনেমার দক্ষ ক্যামেরা ম্যান এসে যেন ওখানেই 'কাট' বলে ওঠে । মায়ের কোনো দুঃখ আমার ছোঁয়া হয় না।টের পাই শত ঝর্ণার জল গড়িয়ে পড়ছে ভেতরে। সে জল কোথায় যায় দেখা যায় না । মনে হয় জল তো পথ কেটে চলে যেতে পারে বেশ, কেউ তাকে আটকাতে পারে না, ভেতরে রহ কথারা সেরকম পারে না কেন ? পথহারা তারকার মতো নির্নিমেষ মায়ের তাকানো । অসহায়বোধ যেন ফেটে বের হয়ে আসতে চায় । নাহ্ তারকার হৃদয়ভেদী গান গগন বিদীর্ণ করতে পারে এমন কোনো শক্তিই রাখে না।পাখির কিচিরমিচির ডাক শোনা যাচ্ছে। ভোর হয়ে এসেছে। নিজের বিছানার ফিরে যেতে আর উৎসাহ জাগে না। ভাবতে থাকি, চারদিক এত সম্পদ নিয়েও তুমি কোন অভিশাপে দীন দরিদ্র রয়ে গেলে ? তুমি আর কখনো কি জেগে উঠবে রাতের অন্ধকারে 'আর একটা প্রভাতের ইশারায়' ? আমার শোবার ঘরের জানালা খুলে ভোরের আকাশের সেই তারার দিকেপ্রশ্নটা ছুঁড়ে দিই। নীরবে চলে যাওয়া থামিয়ে সে কোনো উত্তর দেয় না ।তাকে বড়ো করুণ আর উদাস লাগে।চাঁদের উপেক্ষায় আজ বড়ো আহত সে । একরাশ অপমানের বেদনা বুকে নিয়ে বড়ো অভিমানে আমার দিকে যেন আর মুখ ফেরাতে চায় না। গাঢ় বেদনার ভার নিয়ে অবিরাম একলা চলা তার বুঝি আর কোনোদিন থামবে না!Copyright@ সীমা ঘোষ .১৮/০৪/২০

Comments

Popular posts from this blog

শিলচর মেডিকেল কলেজ