উত্তর পূর্বাঞ্চলের সাহিত্য জগতে শ্যমল বৈদ্য এক পরিচিত নাম, তাঁর সদ্য প্রকাশিত 'ধূসর ট্রিলজি' উপন্যাসের নিবিড় পাঠ।

উত্তর পূর্বাঞ্চলের সাহিত্যজগতে শ্যামল বৈদ্য এক পরিচিত নাম। তাঁর সদ্য প্রকাশিত' ধূসর ট্রিলজি'  উপন্যাসের নিবিড় পাঠ। 

ত্রিপুরায় মনে হয় শ্যামল বৈদ্যই প্রথম ত্রয়ী উপন্যাস লিখেছেন।' উজান ভাটি 'জন্মবদল'  এবং ' চাঁদ চকোরী' । বৈচিত্রে ভরপুর উপন্যাসটি সত্যিই নিবিড় পাঠ দাবী  করে। প্রায় ত্রিশ বছর ধরে লিখে চলেছেন তিনি।'  চাকমা দুহিতা ' তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস।
            দেশভাগের সময় মানুষ এক চরম দুর্যোগ ও দুর্ভোগের শিকার হয়েছে। ওপার থেকে এপারে উদ্বাস্তু মানুষের ধারা সেই ১৯৪৭ থেকে প্রবাহিত। এই জনস্রোতে ত্রিপুরার জনমানুষের ভূমিকা নিয়ে কলম ধরেছেন লেখক শ্যামল বৈদ্য। এখানে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ প্রকট হয়ে উঠেছে। অন্য একটি দেশ থেকে এসে কিভাবে মানুষ নতুন জীবিকা ও বাসস্থানের জন্য হন্যে হয়ে স্থানীয় মানুষজনদের সহায়তা খুঁজে এবং সাহারা পায়, লেখক খুব সুন্দর করে চিত্রিত করেছেন। তা এক স্বতন্ত্র মাত্রার। বাঙালির ভিটে হারানোর ক্ষত এখনো শুকোয়নি, আজও রক্তক্ষরণ হচ্ছে। অবিরাম। 
                            
                    ' ধূসর ট্রিলজি' উপন্যাসের প্রথম পর্ব ' 'উজান ভাটি 'এই পর্বে লেখক  ত্রিপুরা রাজ্যের তরুণ প্রজন্মের কিছু যুবক সুভাষ দিলীপ পূর্ণিমা পারুলদের দিয়ে একটি মুক্তিযুদ্ধের প্লাটফর্ম রচনা করেছেন। শেলিংয়ের  শব্দ যখন তীব্র হয় তখন মানুষরা শহর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে। সুভাষরা শরণার্থীদের আশ্রয় খাদ্য জোগাড় করতে থাকে। রিলিফের ব্যবস্থা করে। ওপার থেকে যারা আসে তাদের রিফিউজি বলা হয়। বেঁচে থাকার জন্য অসহায় মানুষ বয়ে আনা বাসন-কোসন পর্যন্ত বিক্রি করতে বাধ্য হয়। মাটির নিচে গর্ত খুঁড়ে লুকোবার ব্যবস্থা করা হয়। হিন্দু মুসলমান বাদ দিয়ে একটা মিলমিশ হয় মানুষে মানুষে। সময় সময় মিটিং মিছিল বসে, গান তৈরি হয়। সুভাষ নামের ছেলেটা খুব ভালো গান লিখে এবং গায় ও।
                  আখাউরা, নরসিংগড়, বামুটিয়া সিমনা অঞ্চলে প্রচুর গোলাগুলি হয়। আগরতলা শহরের মানুষ বাড়িতেই থেকে যান। ডিসেম্বর ০৩, ১৯৭১ ইংরেজি সময় ৫টা ১৭ মিনিট ওয়েস্টার্ন সেক্টরে ভারত পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হয়। ধর্মনগর কৈলাশহর এবং সারা ত্রিপুরার সীমান্ত অঞ্চলে উদ্বাস্তুরা বিস্তার লাভ করে। জেলার নাম এবং একাত্তরের এই সময়টা লেখক  খুব সুন্দর করে তুলে ধরেছেন।
                  পূর্ণিমা সুভাষ এবং দিলীপেরা মিলে লিফলেট ছাপানো বিলি করা, মানুষকে জমানোর কাজ করে। মানুষের ক্ষত বিক্ষত মনকে  গানের মাধ্যমে একটু সময় ভুলিয়ে রাখে। অসম্ভব ভালো তাদের গায়কী। একসময় পূর্ণিমা এবং সুভাষ এর মধ্যে প্রেম ভাব গড়ে ওঠে। পূর্ণিমা ব্রাহ্মণকন্যা হয়েও সুভাষ এর সাথে পালিয়ে শিলচর যাওয়ার পরিকল্পনা করে। কথাকার সচেতনভাবে শিলচরকে উপন্যাসে জায়গা করে দেন।
        সুভাষ পূর্ণিমা পালিয়ে গিয়েও রেহাই পায়নি, পূর্ণিমার দাদারা লোক লাগিয়ে তাদের এই একাত্ম হওয়াকে ভেঙে দেন।
সুভাষ দূরে, অনেক দূরে চলে যায়। তাদের সাথে রণজিত ছিল বলে সবাই ভাবে সুভাষকে ছেড়ে পূর্ণিমা রণজিতকে নিয়ে পালায়। অনেক জলঘোলা হয়, ভুল বোঝাবুঝি হয়।
 সুভাষের মধ্যে আমরা আমাদের প্রিয় নেতা সুভাষচন্দ্র বসুর চরিত্র দেখতে পাই।
কথাকার লেখেন -
আয়রে যত দামাল পোলা মায়ের অশ্রু মোছা ভাই/ দেখি কে আছেরে ঘাতক বেইমান স্বমূলে করব ছাই/ যদি সবাই মিলে দাঁড়াস ঘিরে মায়ের বেদীতলে/ যদি সবাই মিলে বলিস মাকে, মাগো, চোখে কেন জল?/ মা কী আর কাঁদবেরে ভাই?  ...।
                        
                        (২)   
দ্বিতীয় পর্ব ' জন্মবদল,'
'লংতরাই পাহাড়ের টিলায় উদ্বাস্তুরা বসতি স্থাপন করে।রসুর মা এবং অতসীর সাথে পরিচয় হয়। বৈষ্ণবদের জীবনযাপন আমরা দেখতে পাই। সংসার করেও বৈরাগী  পূর্ণিমা, আবার বৈরাগী হয়ে ও সংসারী অতসী, রসুর 
 মা।
         বন্ধুর খোঁজে দিলীপ এসে পৌঁছে মায়াগড়ের  বৈষ্ণবদের ডেরায়, তার প্রিয় গায়ক প্রানের বন্ধু দেশ সেবক সুভাষকে দেখতে পায়। কিন্তু সে আর আগের সুভাষ নয়। ফকির বদরুজ্জামান এখন। পরিবারের পিড়াপিড়িতে বিয়ে করতে হয় পূর্ণিমাকে, দিবাকর নামের এক প্রতিষ্ঠিত ছেলেকে। সুখের সংসার এগিয়ে যায়। পূর্ণিমা কিন্তু ভুলতে পারেনা সুভাষকে। হন্য হয়ে তাঁকে খুঁজতে থাকে। স্বামীকে সব কথা খুলে বলে। দিলীপের মুখ থেকে সে ফকির বদরুজ্জামান এর কথা জানতে পারে। কী এই সম্পর্ক, এ শুধু প্রেম নয়, তার চাইতে ও অনেক বেশি।
             অতসীর কাছ থেকে সুভাষ এর লেখা গান সংগ্রহ করে পূর্ণিমা। সে গান শুনে, পড়ে আর শুধু আকুল হয়ে কাঁদে। শেষ দেখা হয়েও হইল না। একটা প্রেমের মহত্ব শুধু বিয়েতে নয়। সত্যিকারের প্রেম বলতে কী হয় এই উপন্যাস গুলো পড়লে বুঝা যায়। অপূর্ব সব কাহিনী। স্বতন্ত্র। প্রায় চার পাঁচ খানি প্রেমের আলাদা আলাদা স্তর আমরা দেখতে পাই। সুভাষ-পুন্নি, শাহদত -অনুপমা ছাড়াও রয়েছে দিলীপ আরতির প্রেম। নীরদ পারুলের বিয়ে। পূর্ণিমার ছেলে হৃষিকেশ কৃতিকাদের হৃদয়স্পর্শী সম্পর্ক। সব মিলিয়ে মানবহৃদয়ের ভিন্ন ভিন্ন চাওয়া-পাওয়া আবেগ সংঘাত পাঠক দেখতে পাবেন। এটা আমার দৃঢ়বিশ্বাস। তাছাড়া এই তিনটি বৃহৎ উপন্যাস পড়ে পাঠক ক্লান্ত  হবেন না। কারণ কাহিনীগুলো খুব উত্তেজক।

                 তৃতীয় পর্ব ' চাঁদ চকোরী '   অবশেষে দুটি প্রেম এবং তাকে জড়িয়ে থাকা মানুষের কথাই এখানে তুলে ধরেছেন ঔপন্যাসিক।চাঁদ চকোরী   লেখার সময় কভিদ ১৯ ছিল।বেশ সময় পেয়ে আরম্ভ করেন  --
আসমানেতে উড়ে পাখি মন আগুনে পোড়া /কই গেলে পামু নাগাল রঙ্গিন পাখির আড়া/ও পরান বন্ধুরে/ চেনা পাখি অচিন হইল বন্ধ ফর ফর ওড়া/ চউখের জলে দেখে মোরে সাত জনমের মড়া/
        উপন্যাসের প্রায় শেষের দিকে আমরা দেখতে পাই বদরুজ্জামান ফকির  গ্রামের বাড়িতে আসেন।... " এক মুহূর্ত থমকে গেলেও বুঝতে পারল এ-ই তাদের জন্মান্তরের সুভাষ।  ছুটে গিয়ে বুকের উপর ঝাপিয়ে পড়লো পারুল। ও সুবোরে- বাপ, তুই অতদিন কই আছিলি? তুই কেরে আমরারে ভুইললা গেলি গা বাপ। ঘরে, যাইয়া দেখ, তর বাপ মৃত্যুশয্যায়। সারাদিন মুখে একটাই কথা, আমার সুবোরে আইননা দেও। তরে দেখার লাইগগা আমার পরান ছটপট করে। এতদিন কই আছিলিরে বাপ? কেন আরো আগে আইলি না?"
পিসির কান্দনে গাছের পাতা ঝরে।বাড়িতে জনসমাগম হতে থাকে। কেউ আসে ফকিরের ফু নিতে, কেউ আসে কবজ নিতে। কেউ কেউ ভেবেছিল সুভাষ মারা গেছে তারা এসে ভিড় জমায়।
সুভাষ বাড়িতে আসার খবর শুনে পূর্ণিমা বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। দিবাকর ইতিমধ্যে চলে গেছে না ফেরার দেশে। ছেলে হৃষিকেশ এখন একটি মেয়ের প্রেমে পড়েছে।
 সুভাষের বাবা নীরোদ বাবু মৃত্যুশয্যায়। এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে পূর্ণিমা। নীরদবাবু তাকে খুব ভালোবাসতেন, গান শেখাতেন।পূর্ণিমা ছেলেকে ছেড়ে কুমার ঘাট এসে দিলীপ কে নিয়ে সুভাষের বাড়ি চলে আসে। মনের মানুষকে শুধু একবার দেখবে বলে, মনে ছিল ভয় আতঙ্ক। সুভাষ কি তার সাথে কথা বলবে? কীভাবে তার সাথে কথা বলবে,ভাবতে ভাবতে শেষ পর্যন্ত কথা বলে ফকির বদরুজ্জামান।
 ধলাই নদীর তীরে বসে দুজনে দুজনের মনের কথা আদান-প্রদান করে।" তুমি ফকির আমিতো আমির। প্রচুর টাকা আমার। একবার মত দাও, বাকি জীবন আমরা একসঙ্গে কাটাই। আমার ব্যর্থ স্বপ্ন পূর্ণ করার একটা সুযোগ দেও। ভিক্ষা চাই তোমার কাছে। তুমি শুধু 'হ ' করো।ফকির বদরুজ্জামান কিছুতেই রাজি হয়নি। জাগতিক সুখ থেকে সে অনেক দূরে চলে গেছে। যে একাত্তরের আগরতলায় তারা পাগলের মত কাজ করেছিলো। আর আজ? 
নীরোদ বাবু মারা গেলে শ্মশানে নিয়ে যাবার ফাঁকে  ফকির তার পোটলা নিয়ে পালিয়ে যায়। এ অনুমতি সে বাবা জীবিত থাকতে নিয়েছে। তার আদুরে পুন্নিকে ছেড়ে কোথায় চলে যায় কেউ খুঁজে পায়নি। আসলে তার চাহিদার মৃত্যু অনেক আগেই হয়ে গেছে।
টানটান উত্তেজনার মধ্যে কথাকার শেষ করেন 'ধূসর ট্রিলজি'। শুধু পাকিস্তান বাংলাদেশের যুদ্ধ নয়। নানা জাতি নানা ভাষা সংস্কৃতির সঙ্গে মিলনের নানা স্তর উদ্ভাসিত হয় গল্প গুলোর মধ্যে। অনেক তথ্য তত্ত্বের সংমিশ্রন দেখা যায় গল্পের পরতে পরতে।
 উপন্যাসের সবটুকু বলে দিলে রসিক পাঠকদের জন্য বাকি রইলো কী?
'ধূসর ট্রিলজি 'নিছক একটি উপন্যাস নয়। মুক্তিযুদ্ধের ত্রিপুরার একটা দলিল। উপন্যাসটি পড়তে পড়তে পাঠক পরিচিত হয় এক নিষ্ঠাবান সমাজসচেতন কথাকার এর সাথে। যতই পড়ি শিহরিত   হই। লেখকের ভাষা এবং মেধার কাছে। সামাজিক রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক কোনদিকই বাদ দেননি কথাকার। শব্দচয়ন বাউল গান প্রতিবেদককে  মোহিত করে।
 বইটির প্রচ্ছদ এঁকেছেন ----কৃষ্ণধন আচার্য। 'উজান ভাটি 'উৎসর্গ করেছেন তাঁর মা হিরণ চক্রবর্তীর শ্রী চরণকমলে। যথার্থ এই উৎসর্গ।জন্মবদল  উৎসর্গ করেছেন প্রিয় কবি মানুষ রাতুল দেববর্মাকে। ছাপাখানার ভূত তেমন চোখে পড়েনি।
প্রকাশক--- অনিমা বিশ্বাস 
গাঙচিল 
'মাটির বাড়ি 'ওংকার পার্ক, ঘোলা বাজার, কলকাতা ৭০০১১১
 বইটির বাঁধাই খুব শক্ত পোক্ত।
ঝক ঝকে কাগজ।
সংগ্রহে রাখার যোগ্য বলে মনে করি।
তিন খন্ড মিলে বিনিময় ১০০০ টাকা।
 অনেক অনেক শুভকামনা জানাই।শ্যামল বৈদ্য পড়ুন,প্রেমে থাকুন।

                     আদিমা মজুমদার 
                          সোনাই রোড
                            শিলচর -৬
                            আসাম

##           ##                   ##

            

Comments

Popular posts from this blog

শিলচর মেডিকেল কলেজ