নার্স,ফ্লোরেন্স নাইটেংগল ও কিছু কথা
নার্স,ফ্লোরেন্স নাইটেংগল ও কিছু কথা
আদিমা মজুমদার
শিলচর
*********
সত্য, সুন্দর, দয়া, ধৈর্য , সহনশীলতার প্রতীক হচ্ছে নার্স। প্রত্যেক মায়েরা এক একজন নার্স।মানবসেবার বিশ্ব বিখ্যাত এক মানবী ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল। এক গৌরবোজ্জ্বল কিংবদন্তি।founder of Modern Nursing. ১৮২০ খ্রিস্টাব্দের ১২ই মে ইতালির এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ফ্লোরেন্স শহরে জন্মগ্রহণ করার জন্য মা ফেনী ও বাবা উইলিয়াম তার নাম রাখেন ফ্লোরেন্স। তিনি ছিলেন মা-বাবার দ্বিতীয় সন্তান।তারা দুই বোন।ছোট বোনের নাম পারথে। স্কুল শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে বাবা উইলিয়াম মেয়েকে গ্রীক, ল্যাটিন, ফ্রান্স, ইটালিয়ান, দর্শন ইত্যাদি শিক্ষা দেন। এই বিলাসবহুল জীবনে তাঁকে কে আটকে রাখে। মানবসেবা যার হৃদয়ের মন্ত্র। বাবার ইচ্ছা ছিল মেয়েকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করা। নিজের ঘর 'লি হাস্ট' এর আশেপাশের বস্তিবাসীদের জীবনযাপন, লাঞ্চিত অসহায় ক্ষুধার্ত মানুষের হাহাকার দেখে মাত্র ১৭ বছর বয়সেই তিনি ঘর থেকে বের হয়ে যান। নার্স হওয়াই ছিল তার জীবনের লক্ষ্য।
নাইটিঙ্গেল প্রথমেই আরম্ভ করেন বিভিন্ন হাসপাতাল পরিদর্শন করা। রোম, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, স্কটল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, বেলজিয়াম প্রভৃতি হাসপাতাল এর চিকিৎসা সেবা দেখে তিনি অনুপ্রাণিত হন। রোমের একটি কনভেন্টে গিয়ে কয়েকজন মিশনারী নান সিস্টারদের সঙ্গে দেখা করে তাদের জীবনযাত্রার উদ্দেশ্য উপলব্ধি করতে থাকেন। তারপরে চলে যান ইজিপ্টের আলেক্সান্দ্রিয়ায়। সেখান থেকে সিস্টার অফ চেরেটির ভিনসেন্ট ডিবল এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের কাজকর্মের গতি প্রকৃতি সম্বন্ধে অবগত হন। এই সব পরিদর্শন শেষ করে রোগীদের দুঃখ-কষ্ট দুর্দশা ও অসহায় অবস্থা দেখে জর্জরিত হয়ে যান। ১৮৫২ খ্রিস্টাব্দে তিনি প্যারিস থেকে নার্সিং ট্রেনিং পাস করেন।
ক্রিমিয়ান যুদ্ধে (১৮৫২-১৮৫৬) যখন ইংল্যান্ডের জনজীবন কেঁপে উঠেছিল,, যুদ্ধে অনেক সৈনিক আহত হয়ে পড়ে। সেবা করার মানুষ নেই, চারিদিকে হাহাকার। এই করুণ দৃশ্য, হাজার হাজার মানুষের আর্তনাদ শুনে ফ্লোরেন্স আর নিজেকে সামলে রাখতে পারেননি। মাত্র ৩৮ জন নার্সকে নিয়ে তিনি আহত সৈনিকদের সেবায় নিয়োজিত হয়ে যান। নানা ঘাত-প্রতিঘাত, সীমিত আসবাবপত্র ওষুধ কাপড় তা দিয়েই তিনি খুব কষ্টে সেনা জওয়ান দের সেবা চালিয়ে যান। দেশের বিভিন্ন মানুষের শুভেচ্ছা বাণী তাকে তাঁর জীবনের স্বপ্ন পূরণে অনেক সাহায্য করেছিল। নাইটিঙ্গেল ছিলেন খুবই তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন এবং দুঃসাহসী এক নারী। আমাদের গৌরব। এত কম সরঞ্জাম দিয়ে সেবা করা দুঃসাধ্য। একসময় নাইটেঙ্গেল নিজের মুখ দিয়ে বলেছিলেন এটা হাসপাতাল নয় যেন এক 'নরককুণ্ড '। সময়ের সাথে সাথে অনেক কিছু বদলে যায় কিন্তু প্রশাসন এবং সরকারের বদান্যতায় আজ ও অনেক হাসপাতালে অনেক ডিপারমেন্ট যেন এক একটা ' নরককুণ্ড '। ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি বিরাজমান। সৈনিকরা নাইটেংগলের সেবায় মুগ্ধ হয়ে তাঁকে 'লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প 'উপাধি দিয়েছিল। অনেক সম্মাননা অভিনন্দন শুভেচ্ছা তিনি পেয়েছেন। ১৯০৭ খৃষ্টাব্দে কিং এডোয়ার্ড তাঁকে 'অর্ডার অফ মেরিট 'উপাধি দেন।
পিতৃতন্ত্রের গ্লানিতে পীড়িত মেয়েদের জন্য ১৮৬০ খৃষ্টাব্দে তিনি 'নাইটিঙ্গেল নার্সিং স্কুল 'এবং ট্রেনিং সেন্টার গড়ে তোলেন। ১৯১০ খ্রিস্টাব্দের ১৩ আগস্ট এই অসাধারণ মহিলার জীবনাবসান ঘটে। জাতীয় সম্মানে নাইটিঙ্গেলের সৎকার করা হয়। মহাসমুদ্র এবং আকাশের মত বিশাল হৃদয় যার তাঁকে স্মরণ করা প্রত্যেক নার্সের কর্তব্য। আজও বিশ্বে এমন হাসপাতাল নেই যেখানে নাইটিঙ্গলের চিন্তা ধ্যান ধারণা নেই।
বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সাথে চিকিৎসা সেবার নানা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। আজ Bsc Msc Phd করছে মেয়েরা। শুধু মেয়েরাই নয় নার্সিং ট্রেইনিং নিতে এগিয়ে আসছে ছেলেরাও।চিকিৎসা সেবা প্রদানকারী প্রত্যেক কর্মচারীকেই মানুষ ভগবান রূপে জ্ঞান করে। সেই ভগবান আজ নানা সমস্যায় জর্জরিত। ভগবানের কর্মস্থলে নেই মূত্র ত্যাগের সামান্য সুবিধা। নেই পর্যাপ্ত ওষুধ। তখনই মনে পড়ে যায় ক্রিমিয়ার যুদ্ধের কথা। বোমা বারুদ দালাল সিস্টেমের শিকার হাসপাতালগুলো। জিএনএম ট্রেনিং দিয়ে পোস্ট বেসিক নার্সিং করার সুযোগ আগে ছিল কিন্তু আজ সেটা বন্ধ হয়ে আছে। উচ্চশিক্ষার সুযোগ নেই। জিএনএম ট্রেনিং পাশ করার পর নার্সদের নানা ইন্টারভিউতে বসতে হচ্ছে। এন আর এইচ এম এ টিকা ভিত্তিক নার্স নিয়োগ করা হয়। নেই চাকরির নিরাপত্তা, নেই পেনসন। নানা অনিশ্চয়তায় ভুগছেন নার্সরা। এ এন এম নার্সদের আর ও দুরবস্থা, কেরানির সম্পূর্ণ কাজ তাদেরকে করতে হয়। নার্সরা আজ যন্ত্রসম হয়ে গেছে। রোগী অনুপাতে নার্স সংখ্যা কম। দিনের ডিউটি বাদে নাইট ডিউটি ১২ঘন্টা করতে হয়। সেই নার্স গর্ভবতী হোক কিংবা পঞ্চাশোর্ধ বয়স হোক। সীমিত সুবিধায় রোগীর সেবা করতে নানা সমস্যার সৃষ্টি হয়। কখনো রোগীর অবিভাবক প্রশ্ন করে ওষুধ নেই কেন?তখন অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মোকাবিলা কর্তব্যরত নার্সকেই করতে হয়। তথাপি আমরা নার্সরা সাহস এবং ধৈর্য্যসহকারে কাজ করে যেতে বাধ্য হই।
নানা সমস্যার মধ্য দিয়ে নার্সিং পেশা উন্নতির পথে এগোচ্ছে। নার্স আজ আর অর্ধেক আকাশের চিন্তা করেনা। আকাশের সর্বত্রই তার বিচরণ। যত ঝড় আসুক সেবার মনোভাব যেন ক্ষুন্ন না হয়। " নিজের উপর বিশ্বাস রাখা উন্নতির প্রথম চাবিকাঠি " কথাটি বলেছিলেন এমার্সন।এই কথা মনে রেখে নাইটিঙ্গেলের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে আমরা নার্স মানুষরা যেন মানুষের সেবা অর্থাৎ ভগবত সেবা করে যেতে পারি।
Comments
Post a Comment