প্রেয়সীর আত্মকথা
প্রেয়সীর আত্মকথা
*** *****
আদিমা মজুমদার
শিলচর
" ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে
অন্ধ সে জন মারে আর শুধু মরে
নাস্তিক সেও পায় বিধাতার বর
ধার্মিকতার করেনা আড়ম্বর"
আমাকে আর কবিতা শুনিয়ে ক্লান্ত করোনা প্রিয়ে। এরা এখনো নিজেকে বাঙালি বলে ভাবতে পারেনা। তারা বলে' আমরা মুসলমান' সেই কিশোর বয়স থেকে আজ যৌবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছে অন্য এক যুগে এসে পড়েছি তবু আমরা যে বাঙালি এ কথা ক'জনে বুঝলো।কথাগুলো শুনে উনার পাশে এসে বসে পড়ে আসমা। বলে, দেখো শিক্ষাই হচ্ছে মানুষের আলোর পথের দিশারী। কয়জন মুসলমান ছেলে-মেয়ে স্কুলে যায়। ব্রেঞ্চি পাশ ছাড়া আর কি করে? এই মানব চরিত্র গুলোই তাদের দীর্ঘদিনের খেয়াল। এদের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ো না কারণ তারা নির্দিষ্ট একটা বিধান মেনে চলে। আর বিধান মেনে চলে বলাটা ও সত্য নয়, সে বিধান তারা ইচ্ছে খুশি ভাংগে। সত্যের পথে চলা খুব সুখের নয়। ভালো-মন্দ দুই রকম চরিত্রের মানুষ আদম আলী সাল্লাম এর যুগ থেকে উপস্থিত আছে আর এখনো আছে।
আব্বাস বলে, কে তোমার নাম রাখল আসমা, সত্যিই তুমি আকাশের মতো বিশাল। তোমার অন্তরের সব ভালোবাসা উজার করে দিয়ে তুমি আমাকে আপন করে নিতে চাও, আমারও ইচ্ছে করে তোমাকে সমান ভালোবাসা শ্রদ্ধা বিলিয়ে দিতে কিন্তু যে বিধান আদিকাল থেকে মেনে আসছেন আমাদের গুরুজনরা তাদের বা কিভাবে অশ্রদ্ধা করি। না, আমার মন মানে না। আমি তোমাকে সব অধিকার দেবো আমার উপর কর্তৃত্ব করার। পাছে লোকে যাই বলে বলুক। টাকার জন্য যখন হন্য হয়ে ঘুরে ছিলাম আমার বড় ভাইয়ের নিকট তখন প্রচুর টাকা, তিনি তো ছোট ভাইকে একবারও বললেন না, নে টাকা, আবার ফিরিয়ে দিস সময় মত, বরং মাকে আরো পাঁচটা কথা শুনিয়ে দিলেন। বললেন, তার নেকা বউ এর মাইনে দিয়ে কি করে। গা ভর্তি সোনার গয়না। এই কথা শুনে আসমার খুব খারাপ লাগে। সব গয়না খুলে দিয়ে বলে, নাও দেনা মিটিয়ে দাও, এগুলো আমি রাখবার জায়গা পাচ্ছিলাম না। জানিনা সোনার গয়না বা এমনি গয়না আমার বড় লজ্জা লাগে। মনে হয় নিজের কোনো গুণ নেই আর এইগুলো যেন আবর্জনা। 'আসমা তুমি আমাকে অপমান করছ নাতো? 'কেন তোমার মনে এরকম কথার উদ্রেক হয়। আসলে মেয়েরাও যে কামাই করতে পারে সাহায্য করতে পারে এই অভিব্যক্তি তোমাদের তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিন পরাধীনতার শেকল পরার ফল এই।
মাথা থেকে বারবার কাপড় সরে যায় আসমার। আব্বাস দেখতে থাকে লাল সুন্দর সোনালী চুলগুলো বাতাসে উড়ছে, জাপটে ধরে সে চুলগুলো তিন ভাগ করে বিনুনি করে দেয়। হঠাৎ আসমা দেখে আব্বাসের ডান হাত তার ডান পা ছুঁয়েছে, আসমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠে। আব্বাস বলে, তুমি যদি পায়ের ধুলো কে সেজদা করতে পারো আমি কেন নয়? শুধুই কি তুমি মেয়ে? সেজন্য। আজ থেকে তুমি যা করবে আমিও তোমাকে তাই করবো।
আসমা তামশা করে বলে, তোমরা পুরুষ মানুষ। তোমরা বাজার জাত। তোমাদের জন্মই পাওয়ার জন্য আর আমাদের জন্ম দেওয়ার জন্য। অনেক অনেক পাওয়া হয়ে গেছে আর নয়। আমার বিবেকের দংশন হচ্ছে,-বলে আব্বাস
দূর থেকে চা বাগানের ঘন্টার ঢং ঢং আওয়াজ কানে আসে। দুটি পাতা একটি কুঁড়ির দেশে এখনো মানুষ ঘন্টার আওয়াজ শুনে পথ চলে। মাতৃভাষার জন্য মানুষ মরে। কী আশ্চর্য আশ্চর্য কথা অলৌকিক মনে হয়। সত্যকে মিথ্যার মতো লাগে। আজ বিয়ের পনেরো বছর পর ঘরের সমস্ত দেয়াল ছাদ নতুন ভাবে রং করা হলো। আব্বাস বলে এতদিন তুমি সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে বাসি কাজ শেষ করে আমার জন্য চা করে তবেই আমাকে ঘুম থেকে উঠাও। আজ থেকে এই কাজ আমার। তুমি শুয়ে থাকবে আরাম করবে। আসমার ছোট জা কথাগুলো শুনে হাসতে হাসতে বলে খুব মজা হবে খুব মজা হবে। আমিও উঠবো না কাল ঘুম থেকে। আসমা ওকে শান্ত ভাবে বুঝিয়ে বলে, 'এত স্ফুর্তি করিস না, জানিনা উনাকে কোন ভূতে পেয়েছে। চারকান যখন হবে কথাগুলো তখন বুঝবেন'। জা বলে হোক চারকান, আমি কিন্তু খুব খুশি। আমি দাদা ভাইয়ের সাথে আছি।শোবার ঘরের পেছনে যে প্লাস্টিক গাছটি জড়িয়ে পরগাছাটি ছিল সেটা পেছনের ডোবায় ফেলে আসে আসমা।
কি মহা বিপদ! শুয়ে শুয়ে ভাবে আসমা। এই কাকভোর একগাদা বাসন! অফিস যাওয়া রান্না, বাচ্চা সামলানো, অতিথিসেবা কবিতা লেখা। তার এত দিনের অভ্যাস মুহূর্তে সেকেলে থেকে একেলে হয়ে গেল। আশ্চর্য মানুষের মন। পরিবর্তন হতে সময় লাগে না। বিয়ের আগে অনেকেই আসমার মনকে বিষিয়ে তুলেছিল। এই বিয়ে করছিস! দেখবি তোর ফুটানি কোথায় যায়। কই ফুটানি তো আরো বেড়ে গেল। সেদিন পার্টিতে যাবো শাশুড়ি এসে বললেন জুতোটা বদলাও তো বউ, এই জুতোটা লাগাও। আমি ফ্ল্যাট লাগিয়েছি তুমি কেন ফ্ল্যাট লাগাবে। কথাগুলো জুতো বদলানোর চেয়ে মনে হচ্ছে বদলে গেছে একটা ট্র্যাডিশন। আসমার ঘরের সাথে পৃথিবীর সমস্ত অন্ধকার দূর হয় আলো ছড়িয়ে পড়ছে।
সেদিন ছিল রবিবার। আব্বাসের অফিসের খোদা নামে একটি ছুকরা লাল মোরগ একটা নিয়ে ঘরের সামনে আসে। প্রচন্ড গরম সেদিন। বারান্দায় বসে বাবু বাবু ডাকে। বাবু ঘরে নেই বলে আসমার মাসিটা দরজা বন্ধ করে দেয়। তখনো বাবু ডাক বন্ধ হয়নি। আসমা বের হয়,আসমাকে দেখে লাল মোরগটা তার পায়ের কাছে রেখে জোড়হাত করে কি যেন বিড়বিড় করছিল ছেলেটা। তোতলায় তাই কিছুই বুঝতে পারেনি। এতোটুকু বুঝেছিলো যে কোন কার্যসিদ্ধির জন্য দেবতার চরণে বলি ছড়াচ্ছে। ছেলেটাকে ঘরে এনে ফ্যানের নিচে বসিয়ে ঠান্ডা পানিও খেতে দেয়। আনারস কেটে দেয়।শরীরের আচ্ছাদন দেখে বুঝতে পারে প্রচুর অভাবী ছেলেটা। পঞ্চাশটা টাকা হাতে দিয়ে বলে গাড়ি ভাড়া দিও, আর মোরগটা বিক্রি করে বাচ্চাদের জন্য কিছু খাবার নিও।হতভম্ব হয়ে যায় ছেলেটা।
রাতে বিষয়টা নিয়ে আব্বাসের সাথে আলোচনা করতে গিয়ে বুঝতে পারে এটা স্বইচ্ছায় ঘোষ। তখনই তার এটিএম কার্ডটা আব্বাসের হাতে তুলে দিয়ে বলে নাও, সব টাকা তোমার। তবু এরকম তেজারতি করবে না।
আসমা পান পারাগ ভালোবাসে। দোকানে দাঁড়িয়ে আর কোনদিন পানপরাগ কিনেনি। চুলের কাঁটা তেল বডি লোশন পারফিউম সমস্ত বাজার আব্বাস করে। অফিসে যাওয়ার সময় আসমা দেখে তার জুতো জোড়া সিঁড়িতে চকচক করছে। অফিস থেকে এসে হাতমুখ ধুয়ে চিত হয়ে শুয়ে পড়ে শ্রীজাত বা শুভ দাশগুপ্তের কবিতার বই বুকে নিয়ে। পাঁচ মিনিটের ভিতরে টেবিলের উপর চা মুরি, খোসা ছাড়িয়ে আস্ত একটা ডালিম। কারন আসমার এনিমিয়া ছিল। রাতে রান্না আসমার। আসলটা আব্বাসের দুপুরের, মাসিকে সঙ্গে নিয়ে অফিস যাওয়ার আগে ডাইনিং টেবিল সাজিয়ে রাখে। আসমা শুধু রাইছকুকার থেকে ভাতটা বের করে। আর কি চাই বলুন।
মনে পড়ে আসমার তার বড় বুবুর কথা। তার থেকে বিশ বছরের বড়। খোলা উঠোন। গরমের দুপুর, আম জাম গাছের ফাঁক দিয়ে নদী দেখা যায়। চাঁদ দেখা যায়। দুলাভাই বুবুকে নিয়ে মোটরসাইকেলের পেছনে বসিয়ে যখন প্রথম আসমাদের বাড়ি আসেন বাড়ির সকলেই চমকে গিয়েছিলেন। জেঠিমা বলেই দিলেন, 'বাইকের পেছনে বসে এলি! এতোটুকু লজ্জা করল না!' মেয়ে মানুষের মাথা খেয়ে ফেলেছিস। আজ আসমার ছোটবোন গাড়ি স্কুটি দুটোই নিজে চালিয়ে অফিসে যায়। এভাবেই পরিবর্তনটা মনে হয় খুব ধীরে ধীরে আসে। ডারউইনের থিওরি অফ এভলিউশন এর মতো।আসমার সুপ্ত ইচ্ছা বুঝি তাই ছিল?
## ## ##
Comments
Post a Comment