রুম নাম্বার ১১৪
********
আদিমা মজুমদার
শিলচর
ইংরেজি বলতে হবে, মুনমুনদির কড়া হুকুম। ঘন্টি বাজলে সকালের প্রার্থনা হয় হস্টেলের এন্ট্রান্স এর সামনে। আজ মেট্রন আবার বলে দিলেন, ফার্স্ট ইয়ার স্টুডেন্ট যারা বিকেলে ভেটেরেনারী বাজারে যাবে তারা যেন সন্ধ্যা ছয়টার আগে হস্টেলে ফেরে।
             ১৯৮৩ ইংরাজির ১৯ ফেব্রুয়ারি নার্সিং হোস্টেলে আসে আসিফা। শীতের সেই বিকেল টা ছিল ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। সঙ্গে এসেছিল ছোট বোন মুক্তা এবং বড়দা। এক ঘন্টা ভিজিটর রুমে বসার পর হোম সিস্টার এসে বললেন, ফার্স্ট ফ্লোর এ ১১৪ নম্বর রুম তোমার। চৌকিদারকে ডাকলেন 'এই প্রতিভা রুমটা দেখিয়ে দে 'বড়দা বড় চার ফুট বাই দুই ফুট ট্রাংকটা ধরতেই হোম সিস্টার  বললেন, 'আপনি যেতে পারবেন না রুমে ' কিছু জিনিস কমিয়ে নিলে তারা দুজনে ধরে তুলতে পারবে। আরো কি কি বকবক করেন, নার্স হোস্টেলে ছেলে ডুকা বারন,  এই কথাটা কতবার তাদের বলবো প্রত্যেকটা ভিজিটর... পাগল হয়ে যাবো। কোন জঙ্গল থেকে এরা আসে।
 বলছেন, ট্রাঙ্কটা খুলে জিনিস কমাও, 'প্রতিভা তুইও হাত লাগা। আরেকজন এসে গেলে ভিজিটরের অসুবিধা হবে। আসিফার বুক ধক ধক করে, আসার সময় মা একটি বয়ামে গরুর মাংস উতু দিয়ে দিয়েছেন, বলছেন লুকিয়ে লুকিয়ে খাবি। গ্রামের মেয়ে ডাল ভাত সব্জি বেশি খেতে পারে না, গরীব হলেও দিঘি ভর্তি মাছ, মায়ের পোষা হাঁসমুরগী তারা প্রায়ই খায়।
         বিকেলে মেট্রন সবার রুম চেক করতে বেরিয়েছেন, আসিফা 'where is your bed cover? কি উত্তর দেবে আসিফা, একটাই বেড কভার ছিল বড়দার চকিতে, বাড়িতে আর বেডকভার নেই। মা খুব সুন্দর করে একটা কাঁথা সেলাই করে দিয়েছিলেন সেটাই পাতিয়ে রেখেছে আর নামাজ পড়ার জায়নামাজটা মাঝখানে দিয়ে রেখেছে। ম্যাডাম হাত দিয়ে বলছেন, ' so nice one. '   'I do my namaz here  ' ইংলিশটা ভুল হয়ে গেল নাকি আসিফা দ্বন্দ্বে পড়ে যায়। 
আজ হোম সিস্টার মেয়েদের এনাটমি বিভাগ এবং লাইব্রেরি  দেখান। রাস্তায় ক্রস করে কিছু থার্ড ইয়ার স্টুডেন্টস, হোম সিস্টার বললেন, 'তোমরা তাদের উইশ করলে না? 'ম্যানার শেখো ম্যানার!  কিছু দিন এই ম্যানারের চাপে আসিফার মাথায় কবিতার ভ্রূণ জন্ম নেয়__
No need to say good morning
out of gratitude,
Rather develop polite and
high altitude.
excuse for the sake
is not pure
it is rather
hypocrisy sure...
বাংলা অনার্স নিয়ে পড়বে ভেবেছিল আসিফা কিন্তু জিএনএম ইন্টারভিউ দিতেই সে চান্স পেয়ে যায় কারণ সে ছিল বিজ্ঞানের ছাত্রী। বাংলাকে এতো ভালোবাসে এতো ভালবাসে তবু তার কপালে একি দুর্দশা। ইংলিশ কবিতা লিখতে হলো আর তা spontaneously তার কলমে উঠে এলো। বরাকের তীরে ভাষা  শুধু শখ নয়, যুদ্ধের আরেক নাম। আসিফা ভাবে বিগড়ে গেলো নাতো সে।
              রাতে ঘুমানোর সময় বাড়ির কথা মনে পড়ে। অগ্রহায়ণ মাস চাতাল ভর্তি ধান পাশে উরার (খড়ের)ঘর, জয়নাথ আতাবুন খাজু আম্বিয়া নুর ধবলী  গাই, চড়াই শালিকের খুনসুটি সবকিছুর জন্য তার মন বড্ড খারাপ হয়ে যায়।
সাদা শাড়িটায় নীল দেওয়া নেই, খুব খারাপ অবস্থা।এটা নিয়ে আর ডিউটি যাওয়া যাবে না। শুচিস্মিতার নীল এর কৌটা হাতে নেয়, আবার রেখে দেয়। না বলে নেওয়াটা চুরির পর্যায়ে পড়ে যায় না কি!  আসিফা আবার ভাবে একটু নিলে কি হবে, বন্ধু তো। এক কৌটা নীল কেনার পয়সা নেই ভাবতেই তার চোখ বেয়ে চেপে রাখা কিছু  নোনা জল গড়িয়ে পড়ে।
                     সকাল-বিকাল ক্লাস। বিকেলে  একঘণ্টা খেলা। শটপুট জেবেলিন থ্রো ডিসকাস থ্রো, আসিফা সব বিষয়ে পটু, যেমন খেলা তেমনি পড়া। তার ক্লাসমেট মিরা এবং কমলাকে কিছু সময় অ্যানাটমি ফিজিওলজি পড়া বুঝিয়ে দেয়। পড়াতে পড়াতে নিজের অজান্তেই বাজে খাতাটি ভরে উঠে কবিতায়... 
নার্সিং অ্যানাটমি ফিজিওলজি 
মেডিসিন সার্জারি মাইক্রোবায়োলজি
কমিউনিটি হেলথ কি যে সাবজেক্ট
সিস্টার সান্ড্রা পড়ান একদম পারফেক্ট। 
                মুনমুনদির  নোট লিখে দেওয়া জুতো পালিশ করা কাপড় ইস্ত্রি করা ছাড়াও ফেসওয়াশ করা আসিফার নিত্য কাজ। হাজার হোক সিনিয়রের কথা শুনতে হবে। সুচিস্মিতা রাধামাধব কলেজে পড়তো এবার মেট্রনকে বলে ফাইনাল পরীক্ষা দেবার সুযোগ করে নেয়। রুমে খুব পড়াশোনা করে। আসিফা বন্ধুকে বলে ওর ও ইচ্ছে করে পড়তে।রথীন্দ্র ব্রহ্মচারী,  প্রিন্সিপাল স্যার কি ভালো এককথায় ভর্তি করে দিলেন।
মুনমুন আসিফাকে দিয়ে কাজ করায় বিষয়টি এড়ায়নি মেট্রনের চোখ। এবার তার রুম বদলি করা হয়। সকাল ডিউটি থেকে এসে আসিফা দেখে মুনমুনদির বেডে রম্যাণী। খুশিতে ফেটে পড়ে দুজন। দৌড়ে গিয়ে একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরে, অনেকক্ষণ। একই ক্লাসের দুজন বন্ধু আজ অনেকদিন পরে এক রুমে জায়গা পেলো।
---ঈশ্বর আছেন মণি,রম্যাণী  বলে।
--- কেন ঈশ্বরকে টেনে আনছো, মেট্রন  করেছেন।
       ' তুমি টিফিন টা খেও, চা খাওয়ার আগে। মা এসেছিলেন '
             তোমার মাঝু
                 12:30
 বিঃ দ্রঃ--বাথরুমের কাপড় কাঁচবে না। জল ভরে রেখেছি।
 মেডিকেল কলেজের যে রাস্তা দিয়ে রেইমের দোকানে যাওয়া হয় সে রাস্তার দিকে চেয়ে চেয়ে ব্যালকনিতে বসে টিফিনটা খেতে থাকে আসিফা, বাগানের হলদে গোলাপের দিকে তার চোখ পড়ে...নার্স হোস্টেল থেকে বাইকগুলো বেরিয়ে যাচ্ছে...
      প্রথম প্রথম হোস্টেলে আফিফার খুব খারাপ লাগতো,একমাত্র মুসলিম মেয়ে বলে। আর আজ তার মনে হচ্ছে সারা জীবন সে এই হোস্টেলেই কাটাতে পারবে।
         ' জীবনের এক নাম যন্ত্রনা
 তোমায় ছাড়া আমার কিছু ভাল্লাগেনা '
                 তোমার মণি
               সন্ধ্যা ৭ঃ৩০
 রম্যাণী ডিউটি থেকে এসে আগে টেবিলের দিকে তাকায়, এ্যানাটমি খাতার পাতা ছিঁড়ে লেখা লাইন দুটোর উপরে স্টিলের গ্লাসে দুটো কুল ও রাখা ছিল। কুল একটা মুখে দিয়ে প্রেমপত্র ঠুকরো   হাতে নিয়ে পড়ে, সমস্ত মুখে বুকে স্তনে উরুতে মাখে।সমস্ত শরীর তার উত্তেজনায় ঠগবগ করে উঠে। এই নাইট ডিউটিটা বড় বেজাল।
       রাতে এক বিছানা, গল্পই শেষ হয় না। গল্পের গভীরে যেতে যেতে ভোরের আজান শোনা যায়।এবং সেই মেট্রন এবং রুম বদলি। এবার তারা লুকিয়ে লুকিয়ে সুযোগ বুঝে স্টাডি রুমে মিলিত হয়। একবার না মিললে ঘুম হয় না। শুধু কি তাই আসিফার সাথে রোজা রাখে রম্যাণী। মানে ইফতার সেহেরির সমস্ত আয়োজন করে রাখে। হোস্টেলের মেয়েরা তাদের couple বলে। এসব কথায় তারা পাত্তাই দেয়না।
ট্রেনিং শেষ হতেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয় আসিফাকে। মুসলিম মেয়ে বলে কথা। বেশি বয়স হলে সমাজ কি বলবে। আসিফা শুধু কাঁদতেই তাকে সব সময় তার মুখে  'মাঝু তোমায়  ছাড়া........  বিয়ের রাতে বর কে যেন একটা হিংস্র শৃগাল মনে হয় তার।'  মনি তোমাকে তোমার আল্লাহ আমার জন্য পাঠিয়ে দিয়েছেন সারা জীবন আমরা এভাবেই খুশিতে থাকব '
---আমার গায়ে হাত দিবেন না। বিছানা থেকে নেমে পড়ে আসিফা বাসরঘরটা একটা কাল কুঠুরি লাগছে। দরজা খুলে বাইরের ব্যালকনিতে বসে থাকে।মেঘলা আকাশ । জ্যোৎস্নার কোনো আভাস নেই । মনে পড়ে তার রুম নাম্বার ১১৪।
#########


Comments

Popular posts from this blog

শিলচর মেডিকেল কলেজ