মাদার্স ডে

 শিলচর অরিয়ান্টাল সিনেমা হলে ম্যাটিনি শো দেখে এলেন আব্বা আম্মা। আমার বয়স তখন সাত কি আট হবে। সালটা সম্ভবত  ১৯৭৫।  ছোট দুই বছরের ভাইকে রেখে গেলেন। নাম তার শাইলক। বড় দাদা গুরুচরণ কলেজে তখন বি এ পড়ে।' জুলিয়াস সিজার ' ছিলো  তাদের পাঠ্যবই।

দাদা কেন এই নাম রাখলো, আমি ভেবে পাইনা। এত খারাপ একটা চরিত্র শাইলক। ভাইটা সারাক্ষণ মা মা' করছিল। দাদির কোলেও যায় না, খেতে চায় না কিছু।জ্বালিয়ে মারে আমাকে।

দাদি জোর করে তুলে নিয়ে ঘুমপাড়ানি ছড়া বলেন -

আমার সোনার চাও/ রাতনি আদার খাও/ তোমার মায় কাম কতরা /তুমি ঘুমাই যাও।

ছোট শিশুটি ছড়া শুনতে শুনতে বলে উঠে ,  না মা কাম কতরা না, মা ঘরে নেই। অদ্ভুত ছেলেটা। ' ওই দেখ চড়াই পাখি ওই ওই দেখ শালিক, কাক।

দেখ দেখ আম গাছ কাঁঠাল গাছ নারকেল গাছ। শাইলক বলে, কোথায়?  আমি দেখছি নাতো। এটা মুলগিল বাচ্চা, চেনো না তোমরা।উঠান ভর্তি কাদা, কোলে নিয়ে হাটতে গিয়ে ধপাশ করে পড়ে যাই।সে আমার চুলে ধরে মুখে আঁচড় কাটতে থাকে। কাদার যেনো কোন দোষ নেই। তাকে কষ্ট আমি দিচ্ছি। দেখতে দেখতে দাদি বলে উঠলেন, ' আইজ আউক্কা তোর আম্মা আব্বা, তারার সিনেমা দেখা হিকাইমু।

----- দাদি দাদি মা তো ডাক্তার দেখাতে গেছে

_  চুপ কর, মিথ্যে কথা। এত বয়সে তাদের সিনেমা না দেখলে নয়। লজ্জা শরম নেই।

_  না গো দাদি মায়ের কোমরে ব্যথা।

_ অয় অয় কাম করতে কোমরে ব্যথা আর সিনেমা দেখতে নাই।

_  সিনেমা কি গো দাদি।

_ নটা নটির নাচ।

রাতে মা যখন ফেরে, কয়েক ঘন্টা মায়ের সাথে কথা বলিনি। দাদির পক্ষ নেই। আম্মা-আব্বার হাসিহাসি মুখ। মুখে হিন্দি গানের কলি ' চল চল চল মেরে সাথী ও মেরে হাতি '। চাচা মায়ের মাটির উনুনের জ্বলা লাকড়ি ঠেলে দিয়ে বলেন- কি সিনেমা দেখলেরে মউ। আম্মা চাচুর মুখ টিপে ধরেন। আবার সিনেমার কলি আওড়ান।

 ' নফরত কি দুনিয়া ছোড়কে, খুশ রেহেনা মেরে ইয়ার '।গানের কলি বারবার গাইতে থাকেন। ব্যাগ থেকে বের করে একটা লেবেঞ্চুস চাচুকে দেন, যেটা আমাদের জন্য এনেছিলেন। চড়ার ডিম এবং পাউডার মাখা কমলার কোয়ার মত চকলেট এনেছিলেন। আবছা আবছা মনে পড়ে সেই সোনালি দিনগুলোর কথা।

এই আমার মা।। সাহসী, বীরাঙ্গণা, মহীয়সী। তখনকার দিনে সিনেমা দেখা মানে সমাজচ্যুত হয়ে যাওয়ার ভয়। মা এসব তোয়াক্কা করেন না। মা তুঝে সালাম!

মা তুঝে সালাম।


##               ##                    ##

Comments

Popular posts from this blog

শিলচর মেডিকেল কলেজ