লড়াই কথা

লড়াই কথা -৯
বাঙালি মুসলমান সমাজে সংস্কৃতিচর্চার স্বরূপ
          যে কোনো জাতি বা সমাজের পরিচয় বহন করে সেই সমাজের লোকসংস্কৃতি বা লোকসাহিত্য। ইংরেজিতে যাকে বলে folklore , folk মানে সাধারণ আর lore মানে পরম্পরা। তাহলে একটি সমাজের কথাবার্তা আচার অনুষ্ঠান বিশ্বাস পার্বণ পোশাক-পরিচ্ছদ ইত্যাদি হচ্ছে সেই সমাজের লোকসংস্কৃতি। সাহিত্য সমাজের দর্পণ তাই সাহিত্যের পরতে পরতে আমরা সেই সংস্কৃতির  ছাপ দেখতে পাই।
                   অনেকেই মনে করেন লোকসংস্কৃতি মানেই গ্রামের প্রান্তিক অঞ্চলের সংস্কৃতি। অবশ্যই। সত্তর ভাগ মানুষ ভারতবর্ষের গ্রামেই  বাস করেন। জারি সারি ঝুমুর ভাওয়াইয়া মুর্শিদী মারফতি গাজী চটকা জঙ্গিয়ার গান  প্রবাদ ধাধা ইত্যাদি হচ্ছে লোকসংস্কৃতি বা লোকসাহিত্যর প্রধান উপাদান। মুসলিম সমাজ নির্দ্বিধায় বলা যায় অনেক পিছিয়ে আছে। ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীনতা লাভের সাথে সাথে জাতীয়তাবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। দেশ দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়। দেশভাগের স্পষ্ট চাপ পড়ে আমাদের সংস্কৃতিতে।
মুসলমান সমাজ একেবারে যে কোনো ভূমিকা পালন করেনি তা নয় কিন্তু। "সিপাহী বিদ্রোহ" নামে যে প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ হয়েছিল, বরাক উপত্যকায় তাহা " জঙ্গিয়ার লড়াই " নামে প্রসিদ্ধ হয়। আজও করিমগঞ্জের লাতুতে সেই দিনটি পালিত হয় আড়ম্বরের সাথে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে লোক কাহিনী এবং লোকগীত রচনা হয়, যাহা 'জঙ্গিয়ার গীত' হিসাবে পরিচিত। বেশিরভাগ লেখক এবং গায়ক ছিলেন মুসলমান।
মুসলমান সমাজে লোকসংস্কৃতির প্রভাব তেমন একটা চোখে পড়ে না। বাঙালির লোকসংস্কৃতিই মুসলমানের সংস্কৃতি। আলাদা কিছু নেই।মুসলমানের ঘরে একটি বাচ্চা জন্মের পর তার কানে আযান শোনানো হয় (ছেলে বাচ্চা) আল্লাহর নাম। মেয়ে হলে আযান দেওয়া হয় না। দশ বারো বছর হলে ছেলেকে সুন্নত বা মুসলমানি দেওয়া হয় । মেয়ের কোনো পরিচয় লাগে না।সেদিন অনেক আত্মীয়-স্বজন মুল্লা মিয়াসাবকে  মিষ্টিমুখ করে, ভাত ওখাওয়ার রীতি প্রচলিত আছে।
জন্মের সাত দিনের মাথায় 'আকিকা 'করার নিয়ম। ছাগল বা গরু কেটে এতীম-মিসকীন আত্মীয়_স্বজনদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। খুব গরীব হলে কিছুই লাগেনা।
                বিয়ের সময় কাজি ডেকে রেজিস্ট্রি ম্যারেজ হয়। কবুল পোড়ানোর একটা নিয়ম আছে। জায়নামাজের উপর মেয়েকে পশ্চিম দিকে মুখ করে বসানো হয়। আগে মেয়েকে পড়ানো হয়। মেয়ের মামা বা কাকা মেয়ের পাশে বসে বলবেন - বাগপুর নিবাসী মরহুম মোজাহিদ আলী চৌধুরীর বড় ছেলে হেফজুর রহমান চৌধুরী। এক লাখ টাকা মহর সাব্যস্ত করে, ৫০,০০০ টাকা সোনা বাবদ কাটিয়ে এবং ৫০ হাজার টাকা বাকি রেখে আমাকে উকিল পাঠিয়েছেন।  তুমি কবুল করো। মেয়ে তিনবার শুনার পর বলবে "আলহামদুলিল্লাহ "।তারপর ছেলের কাছে গিয়ে পরিচয় দেবেন।ছেলে ও বলবে " আলহামদুলিল্লাহ " এখানেই বিয়ের রসুম শেষ।আরবি ভাষায় কিছু পড়াশুনা করে দোওয়া করা হয়।নব বিবাহিত দম্পতি যেনো সুখে থাকে।
আগে কন্যা সাজানোর দিন মেহেন্দি পরানো হতো। মেয়েরা গান গাইতেন _(ক)দামান্দ বড় হাউসিয়া, মাথার বেশর আনছইন দামান্দে বাছিয়া,  আর বাজুবন্ধ আনছইন দামান্দে  সুন্দরীর লাগিয়া নারে।...
(খ) সোনার খাটে বইছন ফুলরাণী রুপার খাটে পাওরে না যাইও রাজার দেশে। আমার ফুলরাণী গুয়া খাইতে ডুল্লি বাইয়া পড়েরে  না যাইও রাজার দেশে।...
 এখন আর এসব গানটান হয়না। অর্কেস্ট্রা বাজে।
মুসলিম সমাজের সংস্কৃতি চর্চার ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে আমাকে রীতিমত হোঁচট খেতে হচ্ছে। তেমন কোনো লেখালেখি নজরে পড়েনি। বছরে দুটো ঈদ হয়। ৩০দিন রোজা রাখার পর যে ইদ হয় তাকে ঈদুল ফিতর বলে। আড়াই মাস পরে অনুষ্ঠিত হয় ইদুজ্জোহা বা কোরবানির ইদ।যাকাত দেওয়া হয়।নানা রকম পিঠেপুলি তৈরী হয়।ইদগায় নামাজ পড়েন ছেলেরা।পিতৃতন্ত্র বড় নির্দয় এখানে। 
বাৎসরিক ইদমিলনোৎসব পালিত হয়। কোরআন শরীফ পাঠ এবং কিছু নাচ-গান কবিতা দিয়ে। সংস্কৃতি চেতনার বড় অভাব বোধ করি। 
বরাক উপত্যকায় যারা সংস্কৃতি চর্চা নিয়ে এখনও সজাগ দৃষ্টি রাখেন, তাদের নাম উল্লেখ করতেই হয়, মুজাম্মিল আলী লস্কর নুরুল আলম মজুমদার মাহবুবুল বারি তৈমুর রাজা চৌধুরী ফারুক আহমেদ লস্কর মঞ্জুরুল ইসলাম খান শিহাব উদ্দিন আহমেদ ইমাদ উদ্দিন বুলবুল মিলন উদ্দিন লস্কর প্রমূখ।
সানাই বাদক সুন্দর আলী শুক্কুর আলী গায়িকা তাহেরা বেগম লস্কর মিনা খানম লস্কর কয়েকজন মুষ্টিমেয় মানুষ ছাড়া কেউ এগিয়ে আসতে দেখা যায়নি।
নাচ-গান তামাশা নাটক করা গুনাহ বলে একদল লেজ ধরে পিছে টানতে থাকে। হিজাব আজকাল ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। কতকিছু আমাদের ছিল সব হারিয়ে যাচ্ছে।
 লোকগীতি পল্লীগীতি গাজীর গান ছিল। ছিলো  লাছাড়ি গান। এই গানে শিলচর ইটখোলা ঘনিয়ালার গোলাম রব্বানী সাহেব ছিলেন খ্যাত। কাঞ্চনমালার গান নৃত্য সহ করতেন। কাছাড় জেলার সোনাইতে  আজাদ তইমুছ লস্কর লোকসংস্কৃতি নিয়ে অনেক কাজ করেছেন। গান রচনা করেছেন। তার একটি বিখ্যাত গান কে না মনে রাখে _
চিরসুখী বরাকবাসী 
দুঃখ-কষ্টের নাইরে ভয়।
 শস্যভান্ডার সারি সারি
 দেশ-বিদেশে সবাই কয়।
চিরসুখী বরাকবাসী
 দুঃখ-কষ্টের নাইরে ভয়।।
 পূব সীমায় ভুবন পাহাড় 
ভোলা শিবের তীর্থস্থান 
যেমন শক্তি তেমন ভক্তি
 হিন্দু কিংবা মুসলমান।
 হাজার যাত্রী শিবরাত্রি
 বছর বছর মেলা হয়
 চিরসুখী বরাকবাসী
 দুঃখ কষ্টের নাইরে ভয়।...
কবিগান লিখতেন এবং গাইতেন তেমন কিছু লোকের নাম নিতেই হয়। হাইলাকান্দির মোহনপুরের আফতাব উদ্দিন বড়ভূঁইয়া কাছাড়ের আলাউদ্দিন খাঁ মিরজান আলী কাছাড়ের গোবিন্দপুর নিবাসী ছয়ফুল  মিয়া যিনি কানা ছয়ফুল নামে খ্যাত। ছয়ফুল মিয়ার একটি কবিগান এখানে তুলে ধরছি
"  দিনের নবী মোস্তফায় /হাটিয়া চলেন রাস্তায়/ হরিণ একটা বান্দা দেখেন গাছের গোড়ায় গো/ আরেকদিন এক বনে ইহুদি শিকারিগণে মিলিয়া কয়েকজনে শিকারেতে যায়/ সেই যে কাননে ঘুরি শিকার ও না পায় বিচারে অবশেষে চেষ্টা করে হরিণ দেখতে পায় গো /আর শিকারীরা ফাঁদ পাতিয়া হরিণকে ধরিয়া বান্ধিয়া রাখিল নিয়ে গাছেরই গোড়ায় /গাছ তলাতে বন্দি হয়ে কান্দে হরিণ  আকুল হয়ে  এমন বিপদের কালে কে আমায় তরায় গো/ আশেপাশে দেখে চাইয়া হরিণী বিপাকে দেখিয়া, মাথা মারে কান্দন করে দুই বাচ্চার  জ্বালায় /নিরুপায় হইয়া গেল হরিণ কান্দন জুড়িল দুধের দুইটি বাচ্চার কারণ হৃদয় শুকাইয়া যায় গো /আর হরিণী হায় হুতাশ করে পড়িয়া  গাছের জড়ে দুইটি বাচ্চা অনাহারে কান্দে জঙ্গলায়।...
এককালে মুসলমানরাই গ্রিসের জ্ঞান-বিজ্ঞানকে রক্ষা করেছিল। প্লেটো এরিস্টোটাল সহ ভারতীয় গণিত মুসলমানদের দ্বারা বিকশিত হয়। বিশেষ করে ইবনে সিনা চিকিৎসা ক্ষেত্রে বিরাট অবদান রাখেন। ফলে মুসলমানদের অগ্রগতি তখন কেউ দমিয়ে রাখতে পারেননি। কিন্তু মুসলমানরা যখন পরে কট্টর হয়ে পড়লো, তাদের অগ্রগতি বাধা পায়। মুসলমানদের কাছ থেকেই গ্রীসের জ্ঞান-বিজ্ঞান সংস্কৃতিচর্চা পাশ্চাত্যের হাতে পৌঁছায়। একাদশ-দ্বাদশ সালে, পাশ্চাত্যের পুনর্জাগৃতি বা রেঁনেসার  পর মুসলমানদের কাছ থেকে আরও বেশি গ্রীসের জ্ঞানভান্ডার পেলো  ইউরোপের  বিজ্ঞান চিন্তায় আগ্রহীরা। কিন্তু মুসলমানরা তখন কূপমন্ডুক হতে শুরু করে ওহাবীদের পাল্লায় পড়ে।  উমাইয়া আর আব্বাসীরা যে ভূমিকা রেখেছিল জ্ঞান বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি চর্চায় তা নিস্তেজ হয়ে পড়লো। মুসলমানদের সেই যে পতন শুরু হলো, এখনো সর্বত্র মার খাচ্ছে। সকলকে বুঝতে হবে জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং সংস্কৃতি চর্চা বাদ দিয়ে সামনে এগিয়ে যাবার আর কোনো রাস্তা নেই। যারা সত্যিই এগিয়ে যেতে চায় তাদের সংস্কৃতি চর্চাকে অগ্রাধিকার দেওয়া ছাড়া দ্বিতীয় উপায় নেই।
#                #                     #

Comments

Popular posts from this blog

শিলচর মেডিকেল কলেজ