গল্প, ল্যাংড়া হাবিবুর


ল্যাংড়া হাবিবুর
************
আদিমা মজুমদার 

ল্যাংড়া হাবিবুরকে গ্রামের মানুষ ডাকে ল্যাংড়া হইবুর বলে। পোলিও রোগে তার এক পা ছোট হয়ে যায়, অন্য পা থেকে।  ডান হাতের আঙ্গুলগুলো ও কুকড়া মাকড়া। নিতান্ত গরিব।পোলিও রোগ গরিব মানুষেরই হয় বুঝি।
            ডা. পারভেজ রোজ দেখেন তার সোনাই রোডের ক্লিনিকের সামনে হইবুর একখানা ভাঙা থালা সামনে রেখে বসে থাকে। তিনি একশো দুশো টাকা কোন সময় থালায় ঢেলে দেন। অনতিদূরে একজন অন্ধ বাবাকে নিয়ে বসে থাকে তার মেয়ে ফুলজান। কিছুক্ষণ বসে দোকানে দোকানে তারা ভিক্ষে করতে যায়। যাবার আগে হইবুর মিষ্টি স্বরে ডাকে,-'  ও ফুলজান'  জ্বি, বলুন। চলো আমরা চা খাই। একশো  টাকার নোট ফুলজানের হাতে দিয়ে তিনটা চা তিনটা ক্রিমবন আনতে দেয়।
তিনজন মিলে খুব আয়েশ করে ফুর্তিতে তারা চা খায়। ছোট একটা ঝাড়ু দিয়ে হইবুরের চারপাশ পরিষ্কার করে দেয় ফুলজান। রোজ দেয়। ভদ্রলোকেরা চা খেয়ে পান খেয়ে রাস্তায় যেখানে সেখানে ফেলে দেয় আবর্জনা। 
হইবুর আজকাল মাঝে মাঝে বিড়ি ফুঁকে।এটাকে নেশা বলা যায় না।টাইমপাস। সারাদিন বসা যে কি কষ্টের সে ছাড়া আর কে বুঝবে বলো।
ডা. পারভেজ রোজ হইবুরকে দেখেন। তার মনে বড় কষ্ট হয়। আনকনসিয়াস মাইন্ডের কোন এক জায়গায় সারাক্ষণ হইবুরের মুখ ভাসে, খেলা করে।  একটা হুইল চেয়ার হলে বেচারার এক জায়গায় বসে থাকতে হতো না। তিনি একদিন হইবুরকে বলেন, হুইল চেয়ার একটা হলে তোমার অনেক সুবিধা হবে,তাই না হইবুর?
কথাটা শুনে হইবুর হাতে যেন কে চাঁদ পেড়ে এনে দিয়েছে, এমন খুশি হয়।
 পঞ্চায়েতের বাড়ি হাঁটতে হাঁটতে তার মা হয়রান হয়ে গেছেন। ভোটার আইডি আধার কার্ড জোগাড় করতে পারেন নাই। গরিবের সবকিছুতেই ভেজাল। 
ফুলজান খবরটা শুনে বলে, ভাইজান এখন আপনি চাকার উপর ভর করে চলে যাবেন অন্য কোথাও, দূরে। আমাদের মনে থাকবে কি? কী যে বলিস মেয়ে, বাবা কোথায়? বাবা আজ আসেননি। পেট খারাপ। আমি ঝাড়ু দেবার জন্য এসেছি।
হইবুর মায়াবী কন্ঠে ডাকে,  ' ও ফুলজান ' জি ভাইজান, বলুন। দেখতে দেখতে তুমি বড় হয়ে গেলে। আমার জন্য কি তোমার মায়া হয়?  না হলে কি শুধু শুধু আসতাম ঝাড়ু দিতে। বুঝেছি, তুমি আর একটু বড় হও। বড় হলে কি করবে, জিজ্ঞেস করে ফুলজান।
'তোমাকে বিয়ে দেব।'  ধুর... সলজ্জ মুখে দূরে গিয়ে বসে। আচ্ছা চা নিয়ে আসো,টাকা নাও।চা এনে দুজনে ভালোবাসা রঙের চায়ে চুমু খায়। যেন একজন আরেকজনের গালে চুমু খাচ্ছে। চায়ের কাপে প্রেম উথলে উঠে। কত সুন্দর কত পবিত্র সে প্রেম! ফুলজান চলে যেতে হইবুর আবার ডাকে, '  ও ফুলজান'। জি ভাইজান। এই টাকাটা রাখো, আজকে তো তোমরা কোন কামাই করতে পারোনি। ফুলজান বলে না না লাগবে না। কিছু আলু ও চাল রয়েছে হয়ে যাবে আজ। কী সামান্য তাদের চাওয়া পাওয়া।
                       ডা. পারভেজ তার ওয়ার্ড বয়কে দিয়ে নতুন চকচকে একটা হুইল চেয়ার পাঠিয়ে দেন ক্লিনিক থেকে।  পারভেজ অর্থপেডিক ডাক্তার। সঙ্গে একজুড়ো জুতো ও দেন। মোস্তফা নামের ওয়ার্ডবয়কে বলেন জানো তো আমরা লুলা ল্যাংড়া পঙ্গু এদেরকে কি বলি। মাথা এক দিকে কাত করে জি স্যার জি স্যার, ডিজেবলড বলি।
নতুন হুইল চেয়ারে বসে হইবুরের মনে হয়েছে মোগল সাম্রাজ্যের সম্রাট শাহজাহান যেন তার রাজসিংহাসনে বসেছেন। গলা খাঁকারি দিয়ে শিরদাঁড়া সোজা করে বসে।  কিভাবে চাকা ঘুরাতে হয় প্র্যাকটিস করতে করতে ওয়ার্ডবয় বলে- আমাদের ডাক্তার পারভেজ এতো ভালো মানুষ। জানেন উনার কোন বাচ্চাকাচ্চা নেই। আজ দশ বছর হলো বিয়ের। ম্যাডাম ও গাইনোকোলজিস্ট। কথাটি শুনে হইবুরের প্রাণ  কোচ্ছাত করে ওঠে। উফ! আল্লাহ তুমি এতো নির্দয় কেন। মোস্তফা বলে পুষবেন বলে একটা বাচ্চা পাচ্ছেন না।স্যারকে ভুলে যেওনা। দোওয়া করিও।
কী যে বল মোস্তফা ভাই। আল্লাহকে ভুলে যাব, স্যারের কথা ভুলবো না।শুকুর আলহামদুলিল্লাহ। 
হুইলচেয়ার দেখে হইবুরের মা অজু করে সঙ্গে সঙ্গে দু'রাকাত নফল নামাজ আদায় করেন। শাড়ির আঁচল দিয়ে হুইল চেয়ারটি মুছে ঘরের ভেতর নিয়ে আসেন। এক দুপা হেঁটে জিরোতে হতো ছেলেকে,  আজ সে চলতে পারছে, এর চেয়ে খুশির খবর আর কি হতে পারে মায়ের কাছে। গ্রামের লোক বাচ্চা বুড়ো সবাই দৌড়ে এসে হুইল চেয়ার ছুঁয়ে দেখেন। কেউ কেউ মুখ বাঁকা করে চলে যান।কিছু মানুষের স্বভাব অন্যের ভালো দেখতে পারেনা।
হুইল চেয়ার নিয়ে আজ হইবুর ফুলজানের বাড়ি গিয়ে উপস্থিত হয়। দেখে অন্ধ বাবার পাশে বসে ফুলজান কাঁদছে। চামচ দিয়ে বাবার মুখে পানি দিচ্ছে, গাল বেয়ে পানি পড়ে যাচ্ছে। হইবুরকে দেখে ফুলজান হাউ হাউ করে কেঁদে ওঠে। হইবুর অভয় দিয়ে বলে,' কিছু হবে না।' বলো কি কি আনতে হবে। ভাইজান, চিনির জল মুখে দিচ্ছি বাবার , যদি পারো এক প্যাকেট গ্লোকোজ এনে দাও।
হুইল চেয়ার  নিয়ে দোকান থেকে গ্লুকোজ বিস্কুট চাল ডাল তেল লবণ নিয়ে আসে। ফুলজানের হাতে দিয়ে বলে, আমি যাই আবার আসবো।
                   হইবুর যেখানে হুইলচেয়ার নিয়ে বসে পাশেই জিলানী তার কাঁচা সব্জি বিক্রি করে। জিলানী হইবুরকে দেখে বলে, ভাই তুমি কি একটু সময় আমার দোকানটা পাহারা দেবে? আমি বাড়ি গিয়ে একবার মাকে দেখে আসি। মা বিছানায় অন্তিম শয্যায়।হইবুর বলে,  পাহারা দেবো কেন,বলো কোনটার দাম কত। বিক্রি করে দেবো। একটা টাকাও এদিক সেদিক হবে না। বেশ তাহলে। তোমার ইচ্ছে খুশি বিক্রি করো। বিকেল পাঁচটা বেজে যাচ্ছে জিলানী ফিরে আসেনি। হইবুর অনেকগুলো মাল বিক্রি করে ফেলেছে। বাকিগুলো ব্যাগে পুরে হুইল চেয়ারে করে ঘরে নিয়ে আসে। মায়ের সাথে সব গল্প খোলে বলে। মা বলেন আলহামদুলিল্লাহ। আরো দু'রাকাত নামাজ আদায় করেন। জায়নামাজের উপর বসে জিলানীর মায়ের জন্য দোয়া করেন।
গোসল করে একটু ভাত খেয়ে হইবুর বেরিয়ে যায় হুইল চেয়ার নিয়ে। মা বলেন কোথায় যাচ্ছিস বাবা। রাতকাল। এসে তোমাকে বলবো মা, একজন রোগী দেখতে যাচ্ছি। আমাকে সঙ্গে নিয়ে  যাস না বাবা। এসো মা, আরো ভালো হবে। আমাদের চেয়েও যে মানুষ কত খারাপ অবস্থায় আছে দেখে আসবে।
                   হুইল চেয়ারের পেছনে পেছনে মা হাঁটছেন। দুজনে গল্প করে করে চলে যান ফুল জানদের বাড়ি, আউলিয়া টিলার পেছনে রাস্তার পাশেই পলিথিন বেষ্টিত এক কুঁড়েঘর।কাছে যেতেই শোনা যায় ফুলজনের কান্না। ঘরে ঢুকে দেখেন সব শেষ। অন্ধ বাবার নিথর দেহ আঁকড়ে ধরে ফুঁপিয়ে  ফুঁফিয়ে কাঁদছে  ফুলজান।'  আর আমার এই দুনিয়ায় কেউ নেই'।  গ্রামের কিছু লোক জড়ো হয়। তারা চাঁদা তুলেন। পাঁচশো  টাকা দেয় হইবুর। হইবুরের মায়ের গলা ধরে ফুলজান কাঁদে। মা বলেন কেঁদোনা মা। যার কেউ নেই আল্লাহ আছেন।
                       বাবাকে কবর দিয়ে ফুলজান চলে যায় হইবুরের মায়ের সাথে, তাদের ঘরে। পরের দিন যে কিছু বাসন পত্র ছিল তাও নিয়ে আসে। ৪০ দিন হইবুরের মা খতম পড়েন।এক লাখ চব্বিশ হাজার বার পড়েন। ফুলজান ও পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে বাবার জন্য দোয়া করে।বাবা যেনো বেহেশতে স্থান পান।
হইবুরের মাকে বলতে হয় না ফুলজান এটা করো সেটা করো। নিজের ঘরের মতো সুন্দর করে সে কাজ করে। ঘরটি গুছিয়ে রাখে। হইবুর সকালে যাওয়ার সময় টিফিন নেয়। আজকাল তার প্রচুর কাজ। 
এদিকে জিলানীর মা মারা যান। জিলানী দোকানটি কয়েকদিনের জন্য হইবুরের কাছে সমঝে দেয়।বড় বিশস্ত ল্যাংড়া ছেলেটি। যত টাকা বিক্রি করে  জিলানীর হাতে তুলে দেয়। জিলানী খুশি হয়ে তাকে ৫০০ টাকা দেয়।
                       জিলানী বলে হইবুর ভাই, তুমি না থাকলে আমার এ জায়গাটা বেদখল হয়ে যেত। মাশাল্লাহ! তোমাকে যে কিভাবে আল্লাহ পাঠিয়ে দিলেন আমার কাছে। আচ্ছা হইবুর  ভাই,একটি কথা বলি, ' তুমি আর ভিক্ষে করোনা। আমার দোকানেই বসো, কেমন? তুমি বড় লক্ষী ছেলে।’ এশার আযানের আগেই সব মাল বিক্রি করে ফেলো। হইবুর হাতে আসমান পায়। বলে আলহামদুলিল্লাহ।
 হবিবুরের মা ফুলজানকে দেখে অন্য স্বপ্ন দেখতে থাকেন। অচিরেই তার স্বপ্ন পূরণ হয়।
বিয়ের লাল শাড়িতে আজ এত সুন্দর লাগছে ফুলজানকে, মাথা ভর্তি কোকড়া চুল। ডাগর ডাগর টানা টানা চোখ, যেন এক মূর্তি।এসার নামাজ শেষ করে মসজিদের মিয়াসাব এসে নিকাহ পড়িয়ে যান।শর্টকাট। পাড়ার ছেলে মেয়েরা গিজ গিজ করছে ঘরে।মেয়েরা গান ধরে," সাগর দিঘির চাইরো পারো মুনিয়ায় বাসা করছেরে, নীল মুনিয়ার বাঁশি কে নিলোরে... 
 বাসর রাতে হইবুর ফুলজানের গালে চুমু খেতে খেতে বলে, শুনো ফুলজান আজ একটা কথা তোমাকে বলি, মানবে তো? 
ভাইজান, তোমার কোন কথা মানলাম না বল। না এটা একটা কঠিন কথা। কোন মায়ের পক্ষে মানা সম্ভব না। কিন্তু মানবিকতার কাছে সম্ভব। আর আমাকে ভাইজান না, শুধুই' জান ' ডাকবে।
                 দেখো ফুলজান আজ আমি যে দুপায়ে দাঁড়িয়েছি, কার জন্য বল। ফুলজান বলে, অবশ্যই ডা. পারভেজের জন্য। তিনি তোমাকে হুইলচেয়ার না দিলে তুমি চলতেই পারতে না। ঠিকই ধরতে পারছো।তাই বলছি ফুলজান, আমাদের প্রথম বাচ্চাটা পারভেজ ভাইকে দান করব। আল্লার আরশ খুশি হবে।তারপর আমরা ছেলে হোক মেয়ে হোক একটা বাচ্চা নেবো।
ফুলজান খুশি হয়ে বলে আমি তো একলা বাচ্চা বানাতে পারতাম না। যদি পারতাম আমি পারভেজ ভাইকে দিতাম। জানো সেদিন ওনার ওয়ার্ড বয় এক ব্যাগ সেলাইন ওষুধ খাওয়ার জিনিস দিয়ে যায়। প্রায়ই পারভেজ ভাই আমাকে সাহায্য করতেন। মাশাআল্লাহ! তুমি আমার কলিজার টুকরো। আমার এই কথা মেনে নেবে কিনা ভাবছিলাম। শুকুর  আলহামদুলিল্লাহ।খুব খুশি হয় হইবুর।জড়িয়ে ধরে ফুলজানকে,বাইরে তখন অঝোরে বৃষ্টি পড়ে। ভীষণ ভালো চলে তাদের দিনগুলো। 
                 নয় মাস সাত দিন পর ডা. পারভেজের ক্লিনিকে সুন্দর ফুটফুটে এক মেয়ের জন্ম হয় ফুলজানের। হাবিবুর মেয়েকে কোলে নিয়ে ফুলজানকে দেখিয়ে বলে দোয়া করে দাও, আমাদের মেয়ে একদিন ডাক্তার হবে। ফুলজান মেয়ের মুখে হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। মায়ের চোখ থেকে দু ফোটা জল বাচ্চার টায়েলে পড়ে। হইবুর বাচ্চাকে ভালো করে মোড়ে নিয়ে যায় ডাক্তার পারভেজের চেম্বারে ।  কোলে দিয়ে বলে এই নিন স্যার, সামান্য উপহার। জীবনে শুধু মানুষকে দিলেন, পেলেন না প্রতিদান কিছু।
              ডা. পারভেজ বলে একি করলে হইবুর! না স্যার এটা আমার আগের প্ল্যান করা। ফুলজান ও আপনাকে খুব ভালোবাসে। পারভেজ বাচ্চাটা নিয়ে বউয়ের কোলে দিয়ে বলে, এক বছর আর ডিউটি করতে হবে না। এই তোমার ডিউটি। কার বাচ্চা কিছু জিজ্ঞেস করবে না। কি নাম রাখবে বল, চাঁদনী? না না 'কচি ' ঠিক আছে, কচি থাক। পারভেজের মা ফোন নিয়ে বাচ্চার কাছে বসে আত্মীয়-স্বজনকে খবর  দিতে  থাকেন।আল্লা পরম মঙ্গলময়,তার শুকরিয়া আদায় করেন।
 হইবুরকে টাকা দিতে চাইলে  কষ্ট পায়, নেয়নি। মিস্ত্রি পাঠিয়ে রাতারাতি হইবুরের বাড়িঘর ঠিক করে দেন ডা. পারভেজ।
জিলানীর সাথে ব্যবসা এমন রমরমা হয় বাড়িতে একটা কোল্ড স্টোরেজ রুম ও করা হয়। 
এবার বিছানা নেন হইবুরের মা। প্রায় এক বছর গু-মুত কাড়ে ফুলজান।শরতের শিশিরের মত নীরবতায় মিলিয়ে যান।
 মায়ের মৃত্যুর দিন কোল আলো করে  এক পুত্র সন্তান হয় ফুলজানের। । ডা.পারভেজের বউ বড় একটা টিফিন সাজিয়ে অনেক গুলো কাপড়  দোলনা নিয়ে দেখতে আসেন ফুলজান ও বাচ্চাকে। 
দু বছরের মেয়ে 'কচি ' বাচ্চাটার গালে হাত বুলিয়ে বলে' ভাই '। ফিরিস্তা বাচ্চাকে এই সম্পর্ক কে শিখিয়ে দিল। কে জানে।

###

Comments

Popular posts from this blog

শিলচর মেডিকেল কলেজ