একুশে বইমেলা ২০২৪

একুশে বইমেলা ঢাকা ২০২৪
**********
আদিমা মজুমদার 

মায়ের ভাষায় কথা বলাতে 
স্বাধীনতার পথ চলাতে
 হাসিমুখে যারা দিয়ে গেল প্রাণ 
সেই স্মৃতি নিয়ে গেয়ে যাই গান...
          জীবন কোথায়! তাই খুঁজে বেড়াই। অনেক দিনের স্বপ্ন বুকে গাঁথা ছিল, বাংলাদেশ ঢাকার একুশে বইমেলায় জীবিত থাকতে একবার যোগদান করবো। যাবো যাবো বলে সময় করতে পারছিলাম না, সংসারের গ্যাঁড়াকলে জড়িয়ে ছিলাম  ফেবিকল দিয়ে।চাবিটা কত কেঁদেছে তালার ভেতর ঢুকবে বলে,এবার তাকে লাগিয়ে দিই সংসারের তালায়, ইচ্ছে মতো স্বাধীনতার আনন্দ উপভোগ করতে।বেরিয়ে পড়ি আসাম ইউনিভার্সিটির ফাইনাল সেমিস্টারের ল ' বিভাগের ছাত্রী  নাতনি রূপালীকে সাথে নিয়ে গত ১৮/ ২ /২০২৪  
মাতৃভাষার টান চুম্বকের মতো। শহীদ বরকত সালাম রফিক জব্বার শফিউর... এর রক্তে ভেজা মাটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে অমর একুশে বইমেলা ঢাকায় চলে যাই।
           ভ্রমণের প্রতি পদে পদে ছিল বিস্ময় আর বিস্ময়। শিলচর থেকে সকাল সাড়ে আটটায় আগরতলা এক্সপ্রেস চড়ে চলে যাই করিমগঞ্জ। ট্রেনে সঙ্গী মিলে যান লিংক রোডের দাদা সত্যব্রত দাস পুরকায়স্থ, ওয়াটার রিসোর্স ডিপার্টমেন্টে চাকরি করতেন এখন অবসরপ্রাপ্ত। আরেকজন দাদা তারাপুরের, সুব্রত ধর,আসাম ইউনিভার্সিটিতে কাজ করেন। কথার পিঠে কথা বলতে বলতে করিমগঞ্জের এশিয়া বিখ্যাত শনবিলের কথা উঠে আসে।২৪ ২৫ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ মস্ত বড় অনুষ্ঠান হবে শনবিল।আসাম ইউনিভার্সিটির মানবেন্দ্র দত্ত চৌধুরী স্যার ইউটিউবে খবর প্রচার করছেন। আমাদের  আশার পারদ বেড়ে যায়, একদিন খুব সুন্দর পর্যটন কেন্দ্র গড়ে উঠবে এই জায়গায়। চারপাশে সবুজ বৃক্ষ মধ্যে বিরাট জায়গা জুড়ে জল, নানা রঙের ফুল ফুটে আছে। জলের উপর পদ্ম পাতায় খেলা করে সাপ।এই অনুষ্ঠান ছাড়া যাবেনা, দেখতে হবে।ঢাকা থেকে আসতে চাই ২৫ ফেব্রুয়ারির আগেই।
                   গল্প করতে করতে এসে পড়ি নিউ করিমগঞ্জ। স্টেশনের পাশেই গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছিল আমার নাতনি রূপালীর এক বন্ধু, সে আমাদের  নিয়ে যায় ডলার নিতে শম্ভু সাগর দিঘির বিপরীতে মানি এক চেঞ্জ অফিসে, সেখান থেকে ২০ হাজার ভারতের টাকা দিয়ে ২০০ ডলার পাই। ১০ দিন আগে টাকা এবং পাসপোর্ট দিয়ে এসেছিলাম ভিসা লাগানোর জন্য। একজনের ভিসায় উনি ২৫০০ টাকা নেন।ত্রিপুরা থেকে গেলে কম টাকায় হয়।তারপর চলে যাই সুতারকান্দি বর্ডারে।
এপার ওপার  দুই ইমিগ্রেশন এর অত্যাচার সহ্য করি।ভুলে যাই এই বিরাট পৃথিবীর মানুষ আমরা একই মায়ের সন্তান। সামান্য কাটাতার ডিঙিয়ে আরেকটা দেশ।ভারতের সাথে যে ছিল তাতে কেউ দ্বিমত পোষণ করতে পারবে না।একটা সিএনজি নিয়ে চলে যাই বাংলাদেশের দু'ভাগ বাসস্ট্যান্ডে।আমাদের এখানের মত অটোকে তারা সি এন জি বলে।মানে, কমপ্রেশড ন্যাচারাল  গ্যাস চালিত অটো।
ব্যাগ টানা হ্যাচড়া আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না,একটা বোবা ছেলে কোথা থেকে এসে আমাকে নো ম্যানস ল্যান্ড পার করে দিল।আল হামদুলিল্লাহ,হঠাৎ আল্লার কথা মনে পড়ে গেল, ছোটবেলা দাদি খুব ভয় দেখাতেন আল্লা রাছুলের গল্প করে। মাঝে মাঝে বলতেন যেখানে ঠেকবে আল্লাহকে স্মরণ করো। সত্যিই কি এ আল্লার ফিরিস্তা ছিল। জানিনা।আমি তখন মোবাইল বের করে ভিডিও করছিলাম আর চিল্লিয়ে চিল্লিয়ে আউড়াচ্ছিলাম...  প্রয়াত কবি শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর সেই বিখ্যাত কবিতার লাইন __... যে কেড়েছে বাস্তভিটে, সেই কেড়েছে ভয় /আকাশ জুড়ে লেখা আমার আত্মপরিচয়... 
পুলিশ ধমক দিচ্ছিল,'  এখানে ভিডিও করা মানা,  ভিডিও করা মানা, ' কে শুনে কার কথা, মোবাইল বন্ধ করে দেই।
দু'ভাগ থেকে বাসে করে চলে যাই সিলেট কদমতলী বাসস্ট্যান্ডে, সেখানে দুজন  অচেনা প্রিয় মানুষের সাথে দেখা হয়, মির্জা ভাই ইঞ্জিনিয়ার, আর মিজান ভাই কাস্টমস অফিসার।  চা না খাইয়ে ছেড়ে দেবেন না।ভারতীয় শুনে খুবই আদর করলেন। আমাদের শিলচরে কি কেউ পথটা ভালো করে দেখিয়ে দেবে, সন্দেহ! দারুন আড্ডা হয় চা স্টলে।  তারপর আমাদের সিএনজিতে তুলে পাঠিয়ে দেন কবি মুস্তাফিজুর রহমানের বাড়িতে। চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ পোয়েটস ক্লাব ' হরিপুর বড়বাড়ি ' কামাল বাজার খাজাঞ্চি রাস্তায় স্টেশন রোড ভাবনা হোটেলের মোড়ের সামনে জিঞ্জির শাহের মাজার থেকে আরও কিছু আঁকা বাকা পথ পাড়ি দিতে হয়।পাশেই সুরমা নদী। মনে পড়ে বিশিষ্ট কথাকার রণবীর পুরকায়স্থের উপন্যাস 'সুরমা গাঙের পানি ' এবং তার চরিত্র বইতলের কথা।
সন্ধ্যা গড়িয়ে যায়, পাখিরা ঘরে ফেরে।বারান্দায় বসে মোস্তাফিজুরদার বউ ছেলের বউ অপেক্ষা করছেন। মোস্তাফিজুরদা বাজার করতে গেছেন। মস্ত বড় বাড়ি নানা জাতের গাছ গাছালি বাঁশঝাড়, ভেসে আসছে পাখির ডাক, যেন আমাদের ওয়েলকাম করছে পাখিরা।
সে কি আপ্যায়ন, বাবারে বাবা।সইলতা টেংগার স্বাদ লেগে আছে জিহবায়। রূপালি বলে, 'নানু আমাদের মতোই তারা কথা বলে রান্না করে 'ওর কথা শুনে সবাই অট্টহাসিতে ফেটে পড়ি।রূপালি  প্রথম এসেছে, ওর কত বিচিত্র ভাবনা। 
পরের দিন শাহজালাল দরগা এবং শাহপরান দেখতে যাই পুরো পরিবার। দরগার দিঘিতে গজার মাছ,একেকটার ওজন হবে ৮/১০ কেজি।
আমি হাঁটতে যাই না, বসে বসে মানুষের ভন্ডামি দেখি।দেখি কি দুর্বল মানুষের মস্তিষ্ক বিকৃত কান্ডকারখানা। মোমবাতি জ্বালিয়ে কেঁদে বুক ভাসাচ্ছেন, তাদের একটা ছেলে চাই,কেউ চাইছেন স্বামী যেন পরকীয়া না করে, কেউ রোগ থেকে মুক্তি চাইছেন। 
              ২০ ফেব্রুয়ারি, আকাশ ঘন কালো মেঘে ঢাকা। ঘর থেকে ফোন করছিলেন, শিলচর বৃষ্টি হচ্ছে। আমরা বাসের টিকিট করে বিকেল চারটায় রাজধানী ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। গাড়ির জঙ্গলের ভিড়ের কথা বলে লাভ নেই। রাত সাড়ে বারোটায় পৌঁছালাম বাংলা বাজার।
মুস্তাফিজুরদা আমাদেরকে কিছুটা অসস্তিতে ফেলে দেন,হোটেলের রুম দেখে রূপালি বেকে বসে, বলে এই নোংরা রুমে আমি থাকতে পারবো না।মুস্তাফিজুরদা বলেন, এ রুমে কবি শামসুর রহমান থাকতেন, কবিতা নাটক লিখতেন।বাইরে সাইনবোর্ড লিখা দেখনাই। বিউটি বোর্ডিং বাংলাদেশের ঢাকার পুরনো বাংলা বাজারে ১ নং লেনে অবস্থিত একটি দোতলা পুরাতন বাড়ি,যার সাথে বাঙালির শিল্প-সংস্কৃতির ইতিহাস জড়িত। গুণী মানুষের আড্ডাখানা। 
বাড়িটি ছিল নিঃসন্তান জমিদার সুধীর চন্দ্র দাসের। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পূর্বে সেখানে ছিল সোনার বাংলা পত্রিকার অফিস। কবি শামসুর রহমানের প্রথম কবিতা মুদ্রিত হয়েছিল এ পত্রিকায়। দেশভাগের সময় পত্রিকা অফিস কলকাতায় স্থানান্তরিত হয়। 
বিউটি বোর্ডিংয়ের জন্মলগ্ন থেকেই এখানে আড্ডা দিতেন প্রথিতযশা কবি সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবী শিল্পী সাংবাদিক রাজনৈতিক চিত্রপরিচালক  নৃত্যশিল্পী গায়ক অভিনেতা সহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ। 
এখানে যারা আসতেন -বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান  শিল্পী দেবদাস চক্রবর্তী আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সৈয়দ শামসুল হক মহিউদ্দিন আহমেদ আসাদ চৌধুরী আবু হেনা মোস্তফা কামাল হায়াত মাহমুদ ভাষা সৈনিক ও পুস্তক প্রকাশক মোহাম্মদ সুলতান...
'কবিরা এতো নোংরা হয় জানতাম না ' বলে ওঠে  
রূপালি।ওকে চুপ থাকতে বলি।এতো রাতে কোথায় যাই,কাল চলে যাবো অন্যত্র,কোনোরকম ঘুমিয়ে যাই।রাস্তায় 'জন্নত রেস্টুরেন্ট এবং রিসোর্টে খাওয়া দাওয়া করে এসেছি।দুটো ক্লোনাজিপাম সেবন করে শুয়ে পড়ি।
             ভোরে উঠে পড়ি, টেনশন।সকাল নটায় যেতে হবে বাংলা একাডেমি। দেখি রূপালি নেই, মহা ফ্যাসাদে পড়ি।স্নান সেরে নিই।বাইরে বেরিয়ে দেখি ছেলেদের সাথে জগিং করছে,মুস্তাফিজুরদা অনেক সাবধান করে বলেছিলেন মাথায় অন্তত কাপড় দিলে ভালো দেখাবে,আমাদের তো এ অভ্যেস নেই। উনার কথা মানতে পারিনি। 
রূপালি বলে, আমার বন্ধু ঢাকার এডিশনাল পুলিশ সুপার, আবুল হাসান খুব ব্যস্ত আজ, কথা হয়েছে ফোনে,আমাদের অন্য হোটেল ঠিক করে দেবেন। সাথে সাথেই জিরো পয়েন্ট এ হোটেল এম্পিরিয়েল বুক করে দেন,ফোন মারফত। 
                        রূপালিকে ছেড়ে চলে যাই, বাংলা একাডেমি। 
বিশাল বড় স্টেজ। নাম লেখালাম কবিতা পাঠ করবো,সিরিয়াল নাম্বার ১৮৩,হায় হায় কি করি।চলে যাই পাশে বইয়ের স্টলে। 
বইয়ের স্টল দেখে মাথা ঘুরে যায়। আমার ছেলে  সীমা ম্যাডাম জাহিদ রুদ্র কিছু বই এবং স্টলের নাম লিখে দিয়েছিল,স্টল তো খুঁজে পাই না,আবার চলে আসি স্টেজে,শেষ পর্যন্ত নাম ডেকে, ভারত থেকে আগত সংবাদ মাইক্রোফোনে এনাউন্সমেন্ট করতেই মোবাইল ফোনে ফোটো তোলার হিড়িক পড়ে যায়।
কবিতা পাঠ করে মঞ্চ থেকে নামতেই ফোন নাম্বার বিনিময় পর্ব শুরু হয়।যিনি প্রথমেই  কফি  খাওয়ালেন, উনার নামটা জিজ্ঞেস করা হয়নি।
ইতিমধ্যে রূপালির বন্ধু ঢাকার এডিশনাল এসপি সাইরেন বাজিয়ে গাড়ি নিয়ে উপস্থিত হন বাংলা একাডেমিতে আমাদের নিয়ে যাবেন বেড়াতে।
এতো পুলিশ দেখে লেখক গোষ্ঠী অবাক হয়ে আমাকে ঘিরে ফেলেন,ভারত থেকে না জানি কত বড় মাপের লেখক আদিমা মজুমদার এসেছেন।  মনে মনে হাসি।ঢাকার রিক্সাওয়ালার কথার মধ্যে ও কাব্যিক রস আছে।আমি কোন ছাই।আমি বিনীত অনুরোধ করি যে আমি যেতে পারছি না,লেখক গবেষক মনিরুজ্জামান উপপরিচালক বাংলা একাডেমি,তিনি তাঁর অফিস রুমে কয়েকজনকে নিয়ে আড্ডা দিতে চান। প্রেসমিট ও আছে।
রূপালি একা চলে যায় বন্ধুর সাথে। টিপটিপ বৃষ্টিতে  জমকালো আড্ডা বসে , বই বিনিময় হয়।বিজয়া কর সোমের প্রবন্ধ সংকলন 'ভালো থেকো দেশ ' মনিরুজ্জামানদার হাতে তুলে দিতেই তিনি নামটা উচ্চারণ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, 'আমরাও তাই চাই'।' স্বপ্নের জগতের 'স্বপনের হাতে তুলে দিলাম বিজয়ার গল্প সংকলন ' রেন্ডি', একটা মুচকি হাসি দিয়ে পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে বললেন 'পড়বো '। 
আমার নিজের বই আগেই শেষ হয়ে গেছে। 
ভাবিনি এতো লেখকের সাথে পরিচয় হবে।ফোটোশুট আর শেষ হয় না।চা নাস্তা করে আমরা বেরিয়ে পড়ি অধ্যাপক গবেষক ড.শহিদুল্লাহ আনসারি স্যার এর দুপুরের খাবারের নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে। 
Meherba plaza 
Lift 3
33 Topkhana Road
Dhaka
গাড়িতে নয় শর্টকাট রাস্তায়,  পায়ে হেঁটে। 
রুমালি রুটি কয়েক প্রকার ডাল, সব্জি, সালাদ দৈ। হোটেলের ছেলেরাএসে বলে আর কিছু লাগবে?  বড় আন্তরিক ব্যবহার। পেটের ক্ষুধায় অমৃত মনে হচ্ছিল। ক্ষুধা সকলে বুঝতে পারে না।ধন্যবাদ স্যার। খাবার শেষ হলে আরেক ধস বই বিনিময় হয়। 
আবার হাঁটা।আমি হাঁটছি মাইলের পর মাইল।চেন্নাইর ডাক্তার বলেছিল আমার নাকি অস্টিওপরোসিস, হাড্ডিগুলো থার্মকল হয়ে গেছে।সাবধানে চলতে হবে।মোচড় খেলেই ভেঙে যাবে।২০১৭ আমার ফোর ফিফত লাম্বার ভার্টিব্রা অপারেশন হয় ( leminectomy)
ডাক্তারের কথা আমি মিথ্যে প্রমাণ করলাম।
                 আজ আর বেশি  বই দেখা হলো না।ঢাকার সাংবাদিক লেখক বায়জীদ মাহমুদ কল করলেন, উনার স্টল নাম্বার ২৫৭ এ যেতে, খুঁজেই পাইনি।ফোন কল ও যায় না ওয়াইফাই নেই।দুঃখিত বায়জীদ মাহমুদ ভাই।হাজারের উপর স্টল, হাবুডুবু খাচ্ছি। 
         রাত আটটায় 'স্বপনের জগৎ ' স্টুডিওতে চলে যাই। টিপুসুলতান রোড, ঢাকা। আমার কোনো হেরান লাগেনি। এক রিক্সায় তিনজন মেয়ে উঠি,আমি পাদানিতে বসি।লিপি আর নাসরিন রীনা বসে উপরে। ঢাকা শহর কেঁপে ওঠে আমাদের গানে..." আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু করে লালন বাউল কিছু বাকি থাকেনি।
        ২১শে ফেব্রুয়ারি আমার সোনা মেয়ে জয়ীষার জন্মদিন। ভুলেই গিয়েছিলাম, ছোট্ট করে মেসেঞ্জারে শুভেচ্ছা জানাই। এই দিনটি আমার কাছে অন্য একটা কারণেও তাৎপর্যমণ্ডিত। 'স্মৃতিবিজড়িত একুশে ফেব্রুয়ারি  ' শিরোনামে একটি লিখা আমাদের লকাল পত্রিকায় দিয়ে যাই,জানিনা ছাপলেন কিনা।
পত্রিকা দপ্তরের সাথে যোগাযোগ তেমন নেই।তেল মারা সহ্য হয় না।
অধ্যাপক গবেষক ড. শহিদুল্লাহ আনসারী কবি মুস্তাফিজুর রহমান আশরাফ হোসেন আবুল বাশার নাসরিন সুলতানা জেসি আক্তার নাসরিন জাহান রিনা দিলওয়ার হোসেন ডালিম ভাই,আখি আলমগীর মাসুমা সোমা, একজন থেকে একজন বড় গায়ক,সংগঠক। 
স্বপন তার বাবার স্মৃতিতে ' জসিম উদ্দিন ললিত কলা একাডেমি 'বাচ্চাদের নিয়ে বসে আঁকো প্রতিযোগিতা করায়।রাত বারোটা বেজে যায়,গান আর বক্তৃতায়।আবুল বাসার ভাই আমাদের পৌঁছে দেন, জিরো পয়েন্ট। 
        ২২ ফেব্রুয়ারি মর্নিং ওয়াক করে চলে যাই জাতীয় কবি আমার প্রিয় কবি নজরুল ইসলামের মাজারে। আমার তীর্থক্ষেত্র। গোলাপ গেন্দা যুই মালতী বেষ্টনীতে লাল গালিচায় মোড়া সিঁড়ি, জুতো খুলে উপরে উঠতে চাইলে সিকিউরিটি নিষেধ করে । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই।করব দেখেই আমার বুক ফেটে কান্না আসে।অবিশ্রাম সে কাঁদনে ভিজে যায় চারদিক।এতো সকাল পাশে কেউ নেই।ফোটা ফোটা বৃষ্টি আমার চোখের নোনাপানি মুচে দিতে চায়। এই পথিকের মনের ব্যাথা কে বুঝবে। " কেন মেঘ আসে হৃদয়াকাশে তোমারে দেখিতে দেয় না..."
বলি -জীবনে কতো কষ্ট ছিল তোমার হে কবি।
শুয়ে আছো বকুল বিছানো পথে। স্পষ্ট শুনতে পাই...
" আমি বিদ্রোহী রণ ক্লান্ত/ আমি সেই দিন হব শান্ত /যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না /অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণভূমে রণিবে না/বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত 
আমি সেই দিন হব শান্ত...
ঝালকাঠি বরিশাল যাওয়া হলো না, আফসোস। কবি জীবনানন্দের বাড়ি দেখলাম না।আবার যাবো
...........
               রুমে এসে তৈরি হয়ে আবার বইয়ের ভিড়ে হারিয়ে যাই।পৃথিবীর নানা দেশ থেকে নানা জাতির লোক এসেছে, একুশের বইমেলা দেখতে, কোথাও " রাইতে কেন শালুক ফোটে... আবার কোথাও, জলের ঘাটে দেইখা আইলাম কি সুন্দর শ্যামরাই... গান নাচ ধামাইল চলছে, পেছেনে বিরাট বড় স্টেজে অনবরত চলছে বই উন্মোচন। হঠাৎ দেখি ঢাকার বিশিষ্ট লেখক অধ্যাপক  মোহাম্মদ জাফর ইকবালকে ঘিরে ধরেছে সাংবাদিকরা। সাংবাদিকরা যখন চলে যায় উনি স্টেজে ওঠেন বইয়ের উন্মোচন করতে, আমিও সেই স্টেজে ওনার সঙ্গ দেই, এবং অপেক্ষা করছিলাম উনাকে একা পেতে । পেয়ে যাই। কোনরকম দুটো কবিতার লাইন শুনাই । কমঃ অনিল সরকারের -
একুশ কাঁদে ঢাকার বাড়ি
উনিশ শিলচরে 
একুশ উনিশ ভাষার কান্না 
সকল ভুবন জুড়ে। 
তখন তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেন, তুমি কি লিখো? গল্প না কবিতা? আমি বললাম গল্প কবিতা দুটোই লিখি। উনি বললেন আসাম তো যাইনি কোনদিন, কলকাতা গিয়েছি।খুব বেশি করে পড়বে...এ আমার পরম পাওয়া। 
প্রথিতযশা কবি ' বীর বাঙালী ' পত্রিকার সম্পাদক নজরুল বাঙালী তাঁর ' অনুভবে তুমি ' বইটি এই মঞ্চে উন্মোচন করেন।সাংবাদিকের সামনে আমার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে হয়।
      আমরা কয়েকজন লেখক একটা গ্রুপ হয়ে ঘোরা ফেরা করি, চা খাই বিড়ি খাই।সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দিই,বই কেন পড়া কমে গেছে। একই জবাব,মোবাইলের নেশা।মিলন হয় আরও দুজন ঢাকা,কুমিল্লার মজুমদারের সাথে সোহারাওয়ার্রদী উদ্যানে, রোজি মজুমদার এবং মমতা মজুমদার। রোজী গায়ক,মমতা লেখক। মনে হয়েছে যেন কত যুগের পরিচয়। মমতার সদ্য প্রকাশিত কবিতার বই 'প্রিয়তম দুঃখ আমার ' নেওয়া হয়নি,সময় নেই।
             নেকাব হিজাব বোরখার ধর্মান্ধতা যেমন দেখেছি, দেখেছি প্রকাশ্যে ইউনিভার্সিটির মেয়েদের হাতে সিগারেট। এরকম মেয়েদের সাথে বন্ধু হতে কতক্ষণ? ধুমপানের সাথে সাথে কথা বলা শেষ হয় না, মন্দিরের কাছেই এই জায়গাটা।ভাবলাম দুনিয়াটা একটা নেশা। নেশায় নেশায় মানুষ বাঁচে।বিড়ি - সিগারেটের নেশার মতো কারো মদ গাঁজা আফিম এমন কি নারীকে উপভোগ করার নেশা ও আছে।কারো বইয়ের নেশা। নেশায় কিছু বই কিনি কিছু উপহার পাই।লক্ষীপুরের নাসরিন জাহান রীনার কাছ থেকে ' বিজন মনের কূজন ' কবিতার বই, ড  ইসমত মির্যার ' হুমায়ূন আহমেদ, পরী ও কিছু কথা' আফরোজা জেসমিনের ' হৃদয় পথের বাঁকে' কবিতার বই ড:শহীদুল্লাহ আনসারীর 'নিটোল পৃথিবী ' বাংলা একাডেমি  থেকে ' প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম 'শফিকুল ইসলাম স্বপন দেন 'হিমালয় কন্যা সিকিম ' মোস্তাফিজুরদা বাংলাদেশ পোয়েটস ক্লাবের স্মারক গ্রন্থ 'সাহিত্য সম্ভার 'ও কিছু পত্রিকা উপহার দেন।আরও অনেক বই,ব্যাগ ভারি হয়ে যায়। একুশে বইমেলা ভীষণভাবে এনজয় করি।অভিজ্ঞতার ঝুলি উপছে পড়ে।
 সুষুপ্ত -পাঠক
এর
কথোপকথন 
সুষুপ্ত পাঠক ' বইটি অনেক খুঁজে পাই নি।সময় থাকলে আরও খুঁজতাম।
শফিকুল দাদার সাথে লেখক প্রবীর  মিত্র  দাদুকে দেখে সরাসরি প্রশ্ন করি,'দাদু আমাদের ভারতের সংবাদ পত্রে প্রায়ই দেখতে পাই বাংলাদেশের হিন্দুদের উপর মুসলিমরা অত্যাচার করে,দাদু বলেন এ তাদের দুর্ভাগ্য। সংখ্যালঘুরা পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুক কিছু তো দুর্ভোগ পোহাতে হয়।বড় ভালো লাগে উনার কথাগুলো। 
এবার ফেরার পালা,ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে।
রূপালিকে নিয়ে সবাই ফোটো উঠতে, ভিডিও করতে থাকেন।কান্নাকাটি হয়।আবুল বাসরদা ইলিশ সিদ্ধ নিয়ে আসেন। খেয়ে ধেয়ে আমরা হোটেলে অপেক্ষা করি গাড়ির। সুন্দর যুবতী একটা মেয়ে সঙ্গে থাকলে অনেক উপকার হয়।হাড়ে হাড়ে টের পাই।
২৩/২/২৪ রাত সাড়ে বারোটা আবুল হাসান তার পুলিশের গাড়ি পাঠিয়ে দেন, সঙ্গে লন্ডন এক্সপ্রেস সুপারের টিকিট। পুলিশ আমাদেরকে গাড়িতে উঠিয়ে তারপর যায়।কৃতজ্ঞতা আদায় করতে দেয়নি।মনে থাকবে যতদিন বাঁচি।বিষাদের একটা গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে  চারদিকে। 
           সকাল সাড়ে ছ'টায় পৌঁছে যাই সিলেট। মির্জা ভাই অপেক্ষা করছিলেন। খুব টেনেছেন তাদের ঘরে যেতে,যাইনি।ওয়েটিং রুমে ব্রাশ টাস করে হাতমুখ ধুয়ে চা নাস্তা করি।মির্জা ভাই গরুর মাংসের  পোলাও ভরে দেন টিফিনে রাস্তায় খাবার জন্য। 
বাংলাদেশ বর্ডারে এসে ধরা পড়ি, রোড টেক্সট দিয়ে আসিনি,এক হাজার টাকা ফাইন দিলাম। হোয়াটসঅ্যাপে তারা অনলাইন রোড টেক্সট  দিয়ে রসিদ দেন।ব্যাগ খুলে সব বই তছনছ করে, বইয়ের পরতে পরতে কী খুঁজেন বুঝিনি। 
আসলে এতো ব্যস্ততার মধ্যে ভুলেই গিয়েছিলাম। ঘটনা হলো গায়ক স্বপনকে যখন তার স্টুডিওতে বলছিলাম, ডলার ভাঙতে সোনালি ব্যংকে যেতে,ও বলে যেতে হবেনা, আমি ব্যংকের একজন কর্মীকে ডেকে দিচ্ছি।উনি এসে ডলার এক্সচেঞ্জ করে দেন,তখন ও আমি রোড টেক্সট এর কথা ভুলে যাই।
যাক, ইমিগ্রেশন অফিসের ঝামেলা মিটিয়ে শিলচর পৌঁছাতে বেলা ডুবে যায়।রূপালির চোখে জল,ভুলতে পারে না ভিন দেশের মাত্র চারদিনের আত্মীয়তার কথা, অনবরত চলছে মেসেঞ্জারে ভালোভাবে পৌঁছে যাবার খবর।
চারদিনের কৃত্রিম স্বর্গ হতে বিদায়।হৃদয় বিদারক। সবার মুখ চোখের সামনে ভেসে ওঠে। এডিশনাল পুলিশ অফিসার আবুল হাসান মুস্তাফিজুরদা কাউকে ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করতে চাই না,আপনারা থাকবেন আমাদের হৃদয়ের মণিকোঠায়।একুশে বইমেলা ঢাকা অমর রহে।ঘরে ঢুকতেই অঝর ধারায় বৃষ্টি নামে।



Comments

Popular posts from this blog

শিলচর মেডিকেল কলেজ