জান্নাতে পাথর

জান্নাতে পাথর 

আদিমা মজুমদার 
********
বুবু- দুলাভাই হজ করবেন বলে নিয়ত করেছেন।   পাশের বাড়ির সুরেতুন চাচিআম্মা গতবার হজে গিয়ে এসেছেন, মহিলা গ্রুপের সাথে। ইমাদ উদ্দিন বুলবুল মহাশয়ের  স্ত্রী সঞ্জনাবু মহিলা গ্রুপের লিডার ছিলেন।
           সুরেতুন চাচিআম্মা রোজ বিকেলে বুবুর বাড়ি এসে হজের গল্প করে যান। ফিসফাস করেন।কিছুই শুনতে পাওয়া যায় না। আল্লার বাড়ি দেখে তার  খুশি না দু:খ হয়েছে বলা যাবে না । কতবার ভিড়ে হারিয়ে গিয়েছিলেন, সেজন্য গ্রুপ লিডারের অনেক বকা খেয়েছেন। তিনি আরেকবার যাবেন বলে আশা পোষণ করেন।কিছু খোয়াইস তার বাকি রয়ে গেছে। বুবুর বাড়ি গল্প করার লোভ না পান খাওয়ার লোভে আসেন জানিনা। বুবু -দুলাভাই দুজনে খুব আয়েশ করে পান খান। অসম্ভব সুন্দর তাদের পানদান। কুরশি কাঁটা দিয়ে সেলাই করা একটা উলের বস্তনি দিয়ে পানদান ঢাকা থাকে। বস্তনির কারিগর সুরেতুন চাচিআম্মা। তাদের ঘরের আয়না এবং ফিল্টারের উপরেও এই কারু কাজের পর্দা দেখতে পাওয়া যায়। সুপুরির খোল কেটে ডিজাইন করে ঘর লেপেন।পরিস্কার পরিচ্ছন্ন, একটা সুই মেজেয় পড়লে দেখা যাবে। বড় সৌখিন চাচিআম্মা।অনেক দিন ভিজিয়ে রাখা সুপুরির খোল থেকে রোঁআ বের করে কি সুন্দর সুন্দর রান্নাঘরের জিনিস তৈরি করতেন। 
             মহিম চাচা ছিলেন এলপি স্কুলের মাস্টার। চাকরি করলে কি হবে, ফজরের নামাজ পড়ে হাল নিয়ে যেতেন খেতে। অনেক জমিজমা। বেতনের টাকা দিয়ে শুধু জমি কিনতেন।উনার শালা আলম মাঝেমধ্যে স্কুল  সামলাত। 
হঠাৎ দিঘির ঘাটে পড়ে চাচার প্যারালাইজড হয়ে যায়। শরীরের বাদিক নাড়তে পারেন না। অনেক রোগী দেখলাম, বাদিক অ্যাটাক হয়, কেন কে জানে। ডাক্তাররা ভালো বলতে পারবেন। চাচির অক্লান্ত দিনরাত সেবায় চাচা বেঁচে আছেন।
দুপুরের খাওয়ার পর চাচাকে নিয়ে যান আটচালায়। সেখানে চাচার পায়ে তেল মালিশ করেন চাচিআম্মা।আদরে সোহাগে চাচা আলতো হাতে চাচির বুনিতে হাত বুলোতে বুলোতে  বলেন-' তুমি আমার জন্য এত কষ্ট করছ, আল্লাহ আমাদের একটা আওলাদ ও দিলেন না। তুমি কী চাও আমার কাছে বল, চাচি আম্মা বলেন -আমার আর কোন শখ নেই, ভালোই হয়েছে আওলাদ নেই। দেখেছো, শফিক চাচার পোলা মোবাইল নিয়ে কি যেনো খেলে, সেদিন পুলিশ এসে ধরে নিয়ে গেল। এমন পোলা না থাকা ভালো। আমার একখান মাত্র খোয়াইস, মনের ভিতর জিয়াইয়া রাখছি, একবার আল্লাহর বাড়ি যাইতাম।সুপুরি গাছের মাথায় তখন অস্তমিত সূর্যটার লাল আভা এসে পড়েছে,সেদিকে তাকিয়ে চাচা কোনোরকমে অশ্রু সংবরণ করে বলেন,' আমি তো যেতে পারবো নারে! তুমি যাও, আমার কোন আপত্তি নেই। চাচিআম্মা বলেন তোমাকে ফেলে কেমন করে যাই, ' কিছু হবে না তুমি যাও। আমার আল্লাহর হুকুম নেই। ফুলেরুন তো আছে। আর তো মাত্র দেড় মাসের কাজ। আমি অনেকটা ভালো আগের থেকে। হুইল চেয়ারে বসিয়ে দেবে নুর আহমেদ। এই কথা শুনে চাচার দাড়ি সমৃদ্ধ কপোলে চুমু খেতে থাকেন চাচিআম্মা। নুর আহমেদ এসে দেখে ফেলে। কী লজ্জা, কী লজ্জা! সটান উঠে গিয়ে,মাথার আঁচল টেনে আম্মা নুর আহমেদকে বসতে দেন।
                   গ্রামের প্রায় সকলেই মাগরিবের নামাজ পড়ে চাচাকে একবার দেখতে আসেন
।দুরুদ শরিফ পড়ে চাচার জন্য দোওয়া করেন,চাচি মরশুমি ফল তাদের খেতে দেন।বিরাট বড় বাড়ি, অনেক রকম ফল ফুলের গাছ বাড়িতে। খুব মেহনত করেন চাচা গাছের জন্য,কথা ও বলতেন গাছের সাথে।কী গাছ নেই, কমলা শরিফা নারিকেল কামরাঙা আম কাঠাল সাদা জাম বরই লেবু সফরি কফল লিচু আতাফল এমনকি পানের গাছ ও আছে।লং এর চারা ও লাগিয়েছেন।গোয়ালে গোরু গোলায় ধান পুকুরে মাছ। পূবে পশ্চিমে ঘর।বিধবা বোন ফুলেরুন সারাদিন গাছের নিচে কিছু না কিছু করতে থাকে। 
               প্রতি শুক্রবারে মসজিদের মিয়াসাব সহ গ্রামের এতিম এসিরদের দাওয়াত খাওয়ান চাচিআম্মা। নিজের পোষা মুরগি কেটে। সেদিন প্রচুর গরম ছিল। নুর আহমেদের শরীরে কোন কাপড় নেই, লুঙ্গিটাও গুটিয়ে নিয়েছে। সিরাতুন আম্মার দেবর সে। ঢং -তামাশা করে। আম্মা বলেন, তোমরা ছেলেরা নেংটা হয়ে যেতে পারো গরমে, আমরা পারি না। নুর আহমেদ বলে ' তোমার ব্লাউজের ভিতর বডিসটা দেখলে আমার আর ও গরম লাগে। খুলে ফেলো না এসব। এমনি লোকে কত কথা শুনায়, আর তুমি বলছো ব্লাউজ খুলে ফেলতে। সময় মত খুলি কিনা? নুর আহমেদ আবেগে জড়িয়ে ধরে আম্মাকে।  আম্মা বলেন, ইস, কি দুর্গন্ধ তোমার শরীরে।বমি এসে যাচ্ছে...
              শুক্রবার নুর আহমেদ জুম্মার নামাজ পড়ে একটু আগেভাগে এসে যায়।চাচাকে গোসল করাবে,ভাবিকে রান্নাঘরে এটা ওটা আনতে নিতে সাহায্য করবে। সারা শরীর তার আতরের গন্ধে মম করছে। বদরুদ্দিন আজমল এই আতর গুলা বিলিয়ে ছিল ইলেকশনের সময়। ঢং তামাসার ফাকে একটু আধটু ভাবির শুকনো জমিতে জল ঢালে নুর আহমেদ।
           মহিম চাচা মারা যাবার আজ ৪০ দিন চাচা জীবিত থাকতে হজের সব ফর্ম ফিলাপ করা শেষ হয়ে গিয়েছিল সুরেতুনের। এবার আত্মীয়-স্বজনরা বলে জামাই খাইয়া আর হজ করবার দরকার নেই। সিন্নি বিন্নি রেখে নুর আহমেদের সাথে আগে নিকাহ হোক।
চাচি আম্মার সাথে মসজিদের ইমামেরও নেক নজর ছিল।
গত শুক্রবার বাদ জুম্মা এ নিয়ে হাতাহাতির উপক্রম হয় মসজিদে। নুর আহমেদ দাবি করে ভাবিকে সে বিয়ে করবে। মিয়া সাহেব বলেন' তুমি তো বিবাহিত, তাছাড়া বাচ্চা কাচ্চাও আছে।কেন শুধু ঝামেলা করছো। আমি সিরাতুনকে বিয়ে করতে চাই।
          এশার নামাজ পড়ে গ্রামের কয়েকজন মুরব্বি মিলে সিরাতুনের কাছে আসেন, মিয়া সাবের সাথে বিয়ের আলাপ নিয়ে। সিরাতুন সাফ জানিয়ে দেয়,'  আমি কাউকে বিয়ে করব না। 'একাই থাকব সারা জীবন। আগামী শুক্রবার আমার মুম্বাই থেকে ফ্লাইট। কালই আমি দিল্লি রওয়ানা  হয়ে যাব। সঞ্জনাবু সব ঠিক করে রেখেছেন। আপনারা আমাকে নিয়ে এত উতলা হওয়ার কোন কারণ দেখছি না।
মাঝে মাঝে  বিষাদ শব্দটা মাথার ওপর চেপে বসে সিরাতুনের। পাত্তাই দেয় না। 
            আজ তার যাত্রা শুরু, আত্মীয় স্বজনরা এসে বলে ' আমার জন্য দোওয়া করিও ' একই কথা শুনতে শুনতে সিরাতুনের আর ভালো লাগেনা।' নারায়ে তকবির, আল্লাহ আকবর 'ধ্বনিতে আকাশ বাতাস মুখরিত হয়ে ওঠে। নুর আহমেদ ব্যাগ ট্যাগ গাড়িতে উঠিয়ে দেয়। আঁচলের গন্ধ আর একবার শুঁকে নেয়।
           উড়ো জাহাজে  উঠে সিরাতুন গুন গুন করে গাইতে থাকে - " নিশি রাতে কার বাঁশি বাজে/বাঁশি বাজাইয়া আমার দয়ার মুরসিদ /
কী মায়ার সুরে ডাকেরে আল্লা...।নিচের দিকে তাকিয়ে দেখে ঘর বাড়ি কিছুই নেই, উপরের আকাশের মতো নিচের আকাশটা নীল নয়, সাদা তূলো যেনো উড়ছে।একটা ঘোরের মধ্যে পড়ে যায় সিরাতুনের মন।
           কাবা শরীফ মানে আল্লাহর ঘর। তাওয়াফ করে সিরাতুন রোজ কয়েকবার।নফল নামাজ পড়ে।  'হজরে আসওয়াদ ' জান্নাতের পাথরকে ছুঁতে পারেনা । এখানে ভিড় খুব বেশি। যাদের সঙ্গে স্বামী আছেন তারা গাইড করে নিয়ে যান নিজের স্ত্রীদের। অনেক মানুষ সেখানে পায়ের নিচে পড়ে মৃত্যুবরণ করে।আবেগে পাগল হয়ে যায় মানুষ, যত গোনাহ করেছে দুনিয়াতে, ঠিক মতো হজ পালন করলে সব গোনাহ মাফ হয়ে যাবে,এরকমই বিশ্বাস তাদের।সমসের আলী দুবার হজ করেছে,কপালে নামাজীর নিষ্ঠার কালো দাগ।কিলয়েড( keloid) হয়ে গেছে।
         কাবা শরীফ দেখে সুরেতুনের মুখ থেকে স্বতঃস্ফূর্ত বেরিয়ে আসে 'সোবহানাল্লাহ,কাবার শরীর  ছুঁয়ে তার বুক ভাঙা কান্না আসে। মহিম চাচার কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে নুর আহমেদকে। কোনমতেই নুর আহমেদের সার্ট ছাড়া শরীর তার চোখের সামনে থেকে সরাতে পারে না।এবার দৃঢ়ভাবে প্রতিজ্ঞা করে বাড়ি ফেরে নুর আহমেদকে বিয়ে করবেই।থাকুক তার ছেলে মেয়ে বউ।এজীবনে তার তো ছেলে মেয়ে হবার নয়,ডাক্তার বলে দিয়েছে।
নুর আহমেদকে নিয়ে আবার হজ করতে আসবেন।এবারের হজ তার পরিপূর্ণ হয়নি। সোনার নবীজি যে পাথরে চুমা খেয়েছেন সে পাথরে তার চুমা খাওয়া হলো না।
কাবা শরিফ থেকে মেয়েদের টয়লেট অনেকটা দূরে। সুপার মার্কেটের গ্রাউন্ড ফ্লোরে। সুরেতুন সেখানে যায়।বিরাট বড় বড় আয়না বসানো দেয়াল,অজু করার জন্য একটা একটা আলাদা টেপ,টেপের পেছনে বসার জায়গা,  বসে আরাম লাগে।
হঠাৎ আয়নায় দেখে হাফ প্যান্ট আর ছোট স্লিভলেস গেঞ্জি গায়ে একটি মেয়ে নাচছে,সুরেতুনের হুস উড়ে যায়,ভুল জায়গায় এসে গেলো কি,কারবালার মতো। কত মানুষ হারিয়ে যায়, মরে যায়, কে কার খবর রাখে। শয়তান পদে পদে থাকে, ধোঁকা দেবার জন্য।অজু না করে উঠে দাঁড়ায়। ঘাড় ফিরে তাকায় মেয়েটার দিকে। কি লম্বা নখ,তাতে আলতা পরা।স্তব্ধ হয়ে মোজাইকের উপর বসে পড়ে, দেখে শুধু একটা মেয়ে নয়, অর্ধেক উলঙ হয়ে বাথরুম থেকে বের হচ্ছে অনেক মেয়ে।বডিলোশন মেখে মেজেয় বসে পুরো পার্লারের মতো একেকজন সাজছেন।
লা-হাওলা কু আতা ইল্লা বিল্লাহ।তারপর প্যান্ট সার্ট লাগিয়ে উপরে বোরখা পরে গট গট করে বেরিয়ে তওয়াফ করতে চলে গেলেন। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না সিরাতুন।হায় আল্লা, একি দেখালে তোমার বাড়িতে। 
ভালোয় ভালোয় হজ করতে পেরেছে বলা যাবে না,ফের আরেকবার মিনায় নিজের গ্রুপ থেকে হেরে গিয়েছিল, বুদ্ধি করে একটা টেক্সি ধরে, মিনায় নিয়ে যেতে বলে, ড্রাইভার বাংলাদেশের। 
যত বাজে আবদার শুনতে পায়,শেষ পর্যন্ত কান্নাকাটি করে ড্রাইভারের পায়ে ধরে, মিনায় যায়।সুরেতুন হেঁটেছেন কণ্টকাকীর্ণ বন্ধুর মরুভূমির তপ্ত বালু পথ।ঝমঝমের পানি খেয়ে খেয়ে। অনেক এক্সপেরিয়েন্স হয়েছে তার।
আল্লাহর বাড়িতে ও কুখ্যাত ধর্মীয় বদ্ধুরা থাকে,মানুষ হত্যা করে ধর্ম বাঁচিয়েছে মানুষ। সিরাতুন ছাড়া কে ভালো বুঝবে বলো।পেটে বদহজমের গুড় গুড় শব্দ চলাচল করে। 
সব শেষ করে এবার  বাড়ির পথে পা বাড়ান।
              বাড়ি ফিরে সিরাতুনের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে, শুনতে পায় তার জান্নাতে পাথর নুর আহমেদ আর ইহ জগতে নেই। মিয়া সাহেবের গুন্ডারা তাকে মেরে ফেলেছে। মহিম চাচার কবরের পাশে তাকে কবর দেওয়া হয়।আল্লা যেন তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন।
             সিরাতুনের বাড়িতে ভিড় জমে যায়, বুড়ো জোয়ান সকলে সিরাতুনের মুখের দিকে চেয়ে থাকে।কেমন দু:খ বিলাস করে মেয়েটা,তাও দেখতে চায় গ্রামবাসী।  কি সুন্দর মেয়েটা! স্বামী ও নাই, লাঙ ও নাই।
               নুর আহমেদের  বাবা জীবিত থাকতে ছেলে মারা যায় বলে জমির ভাগ বাটোয়ারা থেকে বঞ্চিত হয় নুর আহমেদের বউ বাচ্চারা।পরাক্রমী কিছু পাথর সেদিন এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে  সুরেতুনের ঘরে।  কালবিলম্ব না করে,  সমস্ত পরিবারকে নিয়ে আসে তার কাছে সুরেতুন  ।হয় যশোদা মা। প্রতিষ্ঠা করে জান্নাতের পাথর নিজের ঘরে।

Comments

Popular posts from this blog

শিলচর মেডিকেল কলেজ