সকালমনি
সকালমনি
*******
আদিমা মজুমদার
আজ কলি- ফোটা প্রভাতে পেশকারের জঙ্গাল দিয়ে হাঁটি। হাঁটি আমি রোজই। প্রচন্ড গরম পড়েছে। দিন দিন গরমটা সহ্যের সীমা অতিক্রম করে যাচ্ছে, যেভাবে অরণ্য ধ্বংস করে বড় বড় বিল্ডিং তৈরি করছে সরকার, তার পরিণতি আর বেশি দূরে নয়, অল্পদিনের মধ্যেই অক্সিজেনের হাহাকার পড়বে।
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ আমার চোখ আটকে যায় রাস্তার পাশে একটি জায়গায়। যেখানে এ অঞ্চলের দোকানের সব বর্জ্য পদার্থ এনে ফেলা হয়। দেখি ছায়ার মত একটি বালক ওই বর্জ্যগুলোকে নিরন্তর ঘেঁটে চলেছে। ঘাঁটতে ঘাঁটতে তার অভীপ্সার দ্রব্যগুলো তুলে নিয়ে রেখে দিচ্ছে তার আকাঙখার থলেতে।মাঝেমধ্যে খাবার জাতীয় কিছু পেলে মুখেও পুরে দিচ্ছে।
এই কুঁড়ি সকালে সে বেরিয়ে পড়েছে খাদ্য সংগ্রহে, সারা দিনের পেটপূর্তির সন্ধানে। মলিন বসন করুন মুখোচ্ছবি। তার সামনে কিছু সময় দাঁড়ালাম। আমার দিকে চেয়ে বলে খুব ক্ষুদা লেগেছে মাসি। সারারাত ঘুমাইনি। কেন ঘুমাওনি জিজ্ঞেস করতে বলে, মামীর সাথে বিল্ডিং ঢালাইয়ের কাজে ছিলাম। দোকান-পাট খোলেনি তখনও। বললাম যাবি আমার ঘরে? এক কথায় চলে এলো আমার সাথে। পরিবানুকে ডেকে বলি 'খুব ভালো করে নাস্তা বানাও, আমার ঘরে সকালমনি এসেছেন'। স্নান করে নাও সকাল মনি, বাথরুমে ঢুকে সে ভ্যাবাচেকা খেয়ে যায়, বলে না না থাক, স্নান করতে হবে না। স্নান করলে খুব আরাম লাগবে, তাকে বুঝাই। আন্দাজ করলাম বাথরুমে হবে না,অভ্যেস নেই।ফুল গাছে জল দেবার কলটা দেখিয়ে, হাতে গামছা সাবান মগ দিয়ে বললাম -কেউ নেই এখানে। ভালো করে স্নানটা করে নাও। তোমার গায়ের কাপড় ওই রশিটায় রেখে দিও।
আমার ছেলের কিছু কাপড় ঘরে থাকে। যাবার সময় সে অনেক কিছু রেখে যায়, কাউকে দেবার জন্য। একটা টিশার্ট পরতে দিলাম। শার্টের পেছনে লেখা -' তুমি এত ভালো কেন '।সকাল মনি লেখাটা পড়ে নেয়।শার্টটা তার নন্টু পর্যন্ত ঢেকে হাঁটু অব্দি চলে যায়। এই দেখলাম সকাল মনির মুখে হাসি! শব্দ করে হেসে বলে -' মাসি এটা কে লিখেছে ',বললাম প্রিন্টার। তুমি পড়তে পারলে। বলে হ্যাঁ। তুমি স্কুলে পড়ো? মাঝে মাঝে যাই, কখনো মামির সাথে কাজেও যাই। কোন ক্লাসে পড়ো। তৃতীয় শ্রেণী।
ইতিমধ্যে পরীবানু ডাইনিং টেবিল সাজিয়ে রেখেছে। পরোটা চা অমলেট, আম আনারস ও এক সাইডে কেটে দিয়েছে। সকাল মনিকে নিয়ে নাস্তা করতে বসলাম। বলে আমি চা দিয়ে পরোটা খাব। আচ্ছা ঠিক আছে। তুমি যেরকম ভাল পাও খাও। আমার দিকে চেয়ে বলে, মাসি তুমি লাল চা দিয়ে শুকনা রুটি খাচ্ছ কেন। দুধ চা খাও না? আমার ডায়াবেটিস দুধ চা খেতে মানা করেছে ডাক্তার।
নাস্তা করতে করতে সকালমনিকে জিজ্ঞেস করলাম, বাড়িতে কে কে আছে? মা বাবা মরে গেছে করোনায়। মামির সাথে থাকি। মামা ও মরে গেছে। মামির এক মেয়ে খুশবু আর আমি, আমার নাম মনি। দুচোখ আমার ভরে যায় জলে।
অমলেটটা হাতে নিয়ে সে বাবানের ফটোর দিকে চেয়ে বলে অনেক দূরে থাকে বুঝি দাদা, আসে? চোখের জল আর বাঁধ মানে না আমার, অঝরে ঝরতে থাকে। তুমি রোজ এসে নাস্তা করে যেও সকালমনি। আমি বৃষ্টি দিলে হাঁটতে পারি না। মামিকে নিয়ে এসো একদিন।
সেদিন থেকে সকালমনির সাথে এক দৃঢ় বন্ধনে জুড়ে যাই। চাইছিলাম আমার কাছে রেখে দেব। মামিও রাজি। বাধ সাধলেন আমার জীবনসঙ্গী, বলেন -দিনকাল ভালো নয়। হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা লাগানোর জন্য কিছু গুন্ডা রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। তোমার ভালো কাজ তারা মেনে নেবে না। তাছাড়া তুমি অসুস্থ, কি দরকার খাল কেটে কুমির আনার।দেখলে না সেদিন প্রিয়াংকা দাসকে ধর্ষণ করে খুন করলো তার প্রেমিক। আর দাঙ্গাবাজরা রাংগির খাড়িতে মুসলমানদের আক্রমণ করতে এসে গেলো।ভাগ্যিস এসপি ভালো ছিল, নাহলে কিয়ামত হয়ে যেতো।
দুই জোড়া শার্ট পেন্ট, একটা শাড়ি এনে ঘরে রাখি। সকালমনিকে কয়েকদিন ধরে দেখিনা, নাস্তা খেতেও আসে না। বাবান ফোন করে সকালমনির কথা জিজ্ঞেস করে। মাঝে মাঝে মিথ্যা কথা বলি । হ্যাঁ নাস্তা খেয়ে যাচ্ছে। কি করি ঠিকানাটাও নেওয়া হয়নি।
ঝিম ধরে পেছনের বারান্দায় গালে হাত দিয়ে বসে চড়ুইয়ের খুনসুটি দেখছি, প্রজাপতি লেবু গাছের ফুলে ওড়াউড়ি করছে। নার্সারি থেকে আনা পেয়ারা গাছে নতুন পেয়ারা ধরেছে। কত রকমের জীবন এ জগতে! হঠাৎ আমার পেছন থেকে জীবনসঙ্গী বলেন -আর ছেলেটার জন্য অপেক্ষা করো না, ও আর আসবে না। রোজ রুটি বাসি করার কোনো মানে হয়?
__ কি বললে? ও যে আসবে না কেমন করে জানলে?
__আমি ওকে আসতে মানা করেছি।
__ একি কথা! তুমি আমাকে জিজ্ঞেস না করে ওকে মানা করলে কেন।
__ আমার এসব ন্যাকামি একেবারে ভালো লাগেনা। নিজের পেটের ছেলে বিদেশ আর অন্যের বাচ্চাকে নিয়ে তোমার আহ্লাদ, ঘেন্না করে।
বোবার মত চেয়ে থাকি মানুষটার দিকে। আমি কিভাবে ভাল থাকব, সেটা সে মোটেই বুঝতে চায় না। কি কান্ডটা করলো বলুন তো।
ডাক্তার এবার হাঁটাও মানা করে দিল। মনে মনে হাঁটি। আর সকালমনিকে খুঁজি। সকাল মনি আমাকে অনেকটা বুঝতো।
( দুই)
আজকাল প্রায় রাতে ঘুম ভাঙে। বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ি।বাথরুমে ঢুকে বেসিনে মুখ ধুই।হঠাৎ মনে পড়ে রাতের ওষুধ খাওয়া হয়নি।পরিবানুকে কত বলি খাওয়াতে বসতেই একবার বলে রাখবি ওষুধের কথা।সে তার নিজের নামই ভুলে যায়।
ছেলের বউ হাইপ্রেসারের ওষুধটা ঠিকমতো সময়ে খেতে হয় বলে এলার্ম দিয়ে রেখেছে, এবার আসলে বলবো সব ওষুধের এলার্ম দিয়ে রাখতে।
স্বপ্নে দেখি সকালমনিকে।এক সাথে নাস্তা করছি,সে বলছে ' জানি দাদার জন্য তোমার মন খারাপ। ' সকালমনি আমার মনের কথা বুঝে।যার সাথে ৩৪ বছর ঘর সংসার করলাম সে আমার কী বুঝলো।মাইনের টাকা ছাড়া আর কিছুই বুঝে না।ছোট ভাইকে এনে উপর তলায় রাখলো, সে এখন ঘর ছাড়ে না।ভাইয়ের বউয়ের সাথে দহরম মহরম চলে।বাজারে নিয়ে গিয়ে ভালো শাড়ি চুড়িদার কিনে দেয়। বউকে কোনোদিন নিয়ে যায়নি বাজারে। লজ্জা! বউয়ের রঙ ময়লা।টাকা ময়লা নয়।মনে হয় তাপ্পড় দিয়ে দাঁতগুলো ফেলে দিই।মাটিতে ফেলে লাথালাথি করি, তবে গা জুড়ায়। শুধু সহ্য করি।
আজ মেয়ে নিয়ে গেলো তার রিসার্চ সেন্টারে, বাইরে এতো সুন্দর ফুলের বাগান, হাঁটাহাঁটি করছি, হঠাৎ দেখি সকালমনির মতো একটি ছেলে, বাগানে কাজ করছে, পাশে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম 'তোমার বাড়ি কোথায়, 'সে আমার দিকে চেয়ে চোখ ফিরিয়ে নিল।
মেয়েকে ফোন দিলাম, বলে 'মা আমি এখন ব্যস্ত আছি' ঘরে গিয়ে বুঝিয়ে বলবো।হ্যাঁ মা,সেই তোমার সকালমনি।
আনন্দে চিতকার দিয়ে বলি, আমার সকালমনিকে পেয়ে গেছি।হাত ধরতেই হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলে। সকালমনির মুখ থেকে যা শুনলাম হতবাক হয়ে যাই।মেয়েকে বকতাম, একটা ভালো গুণ পেলি না।সেই মেয়ে সকালমনিকে তাদের ইনস্টিটিউটে চাকরি দিয়েছে। মেয়ের এহেন বিচার-বুদ্ধির গল্প শুনে আমি হেরে গেছি সেদিন।
Comments
Post a Comment