হেলপার মাসি এবং ফেসবুক

হেলপার মাসি এবং ফেসবুক 
            আদিমা মজুমদার 

আসিফার ছেলে আর তার বাবা হেলপার মাসিদের নিয়ে রীতিমতো গবেষণা শুরু করে দেন। দুই তিন মাস থেকে, মাসিরা চলে যায়, কোনমতে কোনটাকে পার্মানেন্ট করা যাচ্ছে না।
                এবার ছেলে ছুটিতে এসে কিছু পরামর্শ দিল। 
নাম্বার ওয়ান --- মা তোমাকে একটা নতুন মোবাইল কিনে দেবো, তোমারটা হেল্পার মাসিকে দিয়ে দেবে, ও গান শুনবে ইউটিউব দেখবে।
গরীব হলেও তাদের  ও তো একটা মন আছে তাই না।
নাম্বার টু -- চার হাজার মাইনে দিয়ে আজকাল চলে না, জিনিসপত্রের দাম যা বেড়েছে। ওর বেতন এখন ৬০০০ করতে হবে। বেতনটা নিয়ে তোমরা চিন্তা করবে না। আমি দিয়ে দেব।
নাম্বার তিন -- ওকে আমাদের সাথে ডাইনিং টেবিলে খেতে হবে।
        সব শুনে তার বাবা মুখটা বিকৃত করে বললেন, তিন নাম্বার পয়েন্ট আমি মেনে নিতে পারছি না। খেতে বসে গরু ছাগলের মত  এদের মুখ থেকে শব্দ বের হয়, আমি পারবো না বাবা।
আমাকে আমার রুমে নিয়ে দিয়ে এসো ভাত।
_---- মা তোমার কি আপত্তি আছে 
--- না বাবা আমার কোন আপত্তি নেই। আমার বিছানায় শুলেও আমি আপত্তি করব না। আমি জানি হেল্পার মাসি ছাড়া আমাকেই তো সমস্ত কাজ করতে হয়।
---- একটু তো মানিয়ে নিতে শেখো বাবা। ভাত খেয়ে এঁটো থালাটা ও রেখে দাও।তোমাদের পুরুষত্ব! সারা জীবন তো একা একাই কাটিয়ে দিলে। কোন আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতেও যাওনা, মানুষ একা থাকতে পারে না বাবা।দিন বদলেছে,তার সাথে পা মেলাতেই হবে।
--- আমাকে আর জ্ঞান দিস না, তোরা খা, কুকুর বিড়াল সবটাই তো তোমাদের সাথে খায়, ঘুমায়।আমাকে আমার মতো থাকতে দে।
                  মা বাবা বিকালে ওয়ান প্লাস টিভিতে রিমোট স্পিকার দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের নাটক দেখেন। ছেলের প্রডিউস করা পরামর্শ নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন। আসিফা বলে আগের দিন নেই। তোমার ছেলে কি ভালো রান্না করে, ভাবতে পারো? 
আমাদের বাড়িতে পেটে ভাতে মেয়ে লোকরা কাজ করতো। ঝাঁট দেওয়া ঘষা-মাজা  এটাকে কাজই বলা হত না। মা তাদেরকে যাবার সময় চাল পান সুপারি পেঁয়াজ তেল খুদ খুড়া দিয়ে দিতেন। তাছাড়া আমরা ভাই বোন অনেক কাজ করে নিতাম।আমি তো সকালে বাতান থেকে গরু ছেড়ে গোবর ফেলে গোসল করতে যেতাম।
                   আজকাল পরিবার ছোট হয়ে শহরকেন্দ্রিক হতেই এই ঝামেলায় মানুষকে পড়তে হয়েছে। ছেলের শর্তগুলা একবার মেনে নিয়ে দেখি,তারা এই যন্ত্রযুগে জন্মেছে।আমাদের থেকে মেধা বেশি। 
আমার বিরক্ত লাগে, মেয়েটা সারাদিন ফোন কান থেকে সরায় না। বড় এন্ড্রয়েড পেলে কি করবে জানিনা।

         --  মামি মামি আমার ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট একসেপ্ট করো। কোয়েল দিদি আমাকে ফেসবুক খুলে দিয়েছে।
-- আর কাজ পায়নি কোয়েল। কিসের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট। আমার হাজারের উপর ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পড়ে রয়েছে। ঘরে কত কাজ, ব্যস্ততা, আমি পারিনা।
-- প্লিজ মামি একসেপ্ট করো। আমি সারাদিন ফোন নিয়ে বসবো না। কাজ করে পরে ফোন ধরবো। দেখবেন। 
--- আচ্ছা দেখি, কি নাম।
---  সালমা খাতুন। 
-- তোর নাম যে সুফিয়া। 
--- না মামী, আমার আসল নাম দিই নি। দুষ্টু ছেলেরা পিছু লেগে যাবে।
-- মিথ্যে কথা তোমাদের গায়ে লাগেনা,না? 
মোবাইল হাতে নিয়ে প্রোফাইল ছবিতে দেখি একজন নায়িকার ছবি। 
--- তুই নিজেকে  কি ভাবিস, বিদ্যা বালান হয়ে গেছিস নাকি
-- না মামি, কি যে বলো, নিজের ছবি দিলে অসুবিধা আছে। 
-- আমি তো আমার ছবি দিলাম। কোন অসুবিধা হয়নি আজ পর্যন্ত। 
              আজকাল সুফিয়াকে আর কাজের তাড়া দিতে হয়না। খুব তাড়াতাড়ি সুন্দর করে কাজ করে। চকির তলা চেয়ারের নিচ আলমিরার উপর মুছামুছি উঠোন ঝাঁড় নিজের থেকেই করে। খাওয়ার পর ডাইনিং টেবিলের পা থেকে মাথা চকচক করে।পিঁপড়ে বিদায়। 
               আসিফা যামিনী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রাক্তন এসিস্ট্যান্ট মেট্রন, কাজের খুব নামডাক ছিল। পরিস্কার পরিছন্নতার বাতিক আছে।মাত্র রিটায়ার্ড করে, সোনাই রোড নিউ মজুমদার লেনে ঘর করেছে। এখানেই থাকা। মেডিকেলের মুমূর্ষ রোগীদের নিয়ে সেই চাপ হাহাকার থেকে অনেক দূরে, খুব রিলাক্সড দিনগুলি কাটছে।
আসিফার আবার গল্পের প্রতি প্রচণ্ড টান। সারাক্ষণ বই পড়তেই থাকে। এই ২০২১ সালে তার 'পাখির বাসা ' গল্প ত্রিপুরা ইউনিভার্সিটিতে পাঠ্য  বইয়ে স্থান পায়। সেবার স্বীকৃতি স্বরূপ বা লেখালেখির জন্য অনেক পুরস্কার সম্মাননা পায়।
               আসিফা লক্ষ্য করে সুফিয়া আজকাল আর দুপুরে ঘুমোয় না। মুখে মুলতানি মাটি টমেটো লেবু ঘষতে থাকে। চুলের আগা কেটেছে। স্টোর রুমে ঢুকে কি করে, বুঝা মুশকিল। কোয়েল বলে, মা তুমি না থাকলে সুফিয়া তোমার শাড়ি পরে। মেয়েকে কিছু বলি না, চুপ থাকি। ভাবি,ইসট্রজেন প্রজেস্টোরন হরমোন এর জন্য মেয়েদের শরীরে কত যন্ত্রণা হয়, কে বুঝবে।
আজকাল  দারুন একটা আভা তার মুখ থেকে ছড়িয়ে পড়ে।কথা শিখেছে খুব।সেদিন সাহিত্য আড্ডায় এসে দীপাঞ্জলি পাকঘরে ঢুকে সুফিয়াকে বলেছিল, 'আমাকে এক গ্লাস গরম জল দিও ', জল খেয়ে থেংক ইউ বলতেই সুফিয়া বলে  ' ওয়েলকাম '। দীপাঞ্জলি আসিফকে বলে, দারুণ শিস্টাচার শিখিয়েছ মেয়েটাকে।
অনেকে ধরতেই পারে না যে সুফিয়া তার মেয়ে নয়।
            আজ অনবরত বৃষ্টি হচ্ছে। শহরের অলিগলি ফুটপাত জলে ভরে গেছে। ভূইয়া শফিকুল ইসলামের'  হিমালয় কন্যা সিকিম ' বইটি পড়ছে আসিফা। খুব হালকা মেজাজে। সুফিয়া এসে কাছে বসে বলে, আজ ঠান্ডা দিন মামি, তোমার মাথায় একটু তেল দিয়ে দেই, অনেকদিন হয়ে গেছে বডিতে তেল মালিশ করিনি। বই রাখো, বিছানায় এসো, তেল মালিশ করি।
আরাম পেয়ে আসিফার দু চোখ বেয়ে ঘুম নেমে আসে।
-- মামি, ঘুমিয়ে পড়লে নাকি। একটা..., একটা কথা বলব, শুনো মামি
_-- কি কথা বল না মেয়ে, আমার ভীষণ ঘুম পাচ্ছে।
_-- বলছিলাম
-- কী, বলবি বলবি করে বলিস না কেন।
--- বলছিলাম
--- আবার একই কথা
--- বলছিলাম এখন তো মার্চ মাস, জুলাইয়ের  ১৭ তারিখ কুরবানীর ঈদ। তারপর আমি বাড়ি যাব। এক সপ্তাহের জন্য ছুটি চাইছি। মামি, এই ক'মাস আর আমি বাড়ি যাব না। আর আরেকটা কথা দুই মাসের এডভান্স আমাকে দিও মামি। আমি আর কোনদিন এডভান্স চাইবো না।
                আসিফা কিছু সময় বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। বলে, দেখি তোর মামার সাথে দাদার সাথে আলাপ করে, তারা কি বলেন।
-- কিছু কও মামি
--- কিতা কইতাম এক সপ্তাহ আমি কি সংসার চালাইতে পারমু। আগের বারও তুই বাড়ি গিয়ে  আটকে গেলে, তোরে তেল মারিয়া আনা লাগে।
-- মামি, মামি দো , প্লিজ এবার আর ইতা অইতো না। আগে বেতন অতো কম আছিল, মোবাইলও আছিল না, দাদায় আমারে কইছে, 'সারা জীবন থাক, তুই যেটা চাইবে দিমু।' ছোট বোইনর একটা বিয়ার মাত চলের কথাবার্তায় হইলে ইগুরে বিয়া দিলাইতাম।
    আসিফা ভাবে, না মানলেও বিপদ। যদি একেবারে চলে যায়, তার চেয়ে এক সপ্তাহ ছুটি ঠিক আছে। কাজের মানুষ পাওয়া যায় না, ওষুধ হয়ে গেছে।এদের হ্যাপা যে সামলেছে সেই বুঝেছে 
_-- ঠিক আছে যাবি, কিন্তু কথা মত আসবি। এখনো তো অনেক দিন বাকি, সময় আসুক দেখা যাবে।
                 বিকেলে উপরের ব্যালকনিতে মাঝে মাঝে বসে আসিফা, সূর্য ডুবা দেখে।ব্যালকনি থেকে রাস্তায় আজব দৃশ্য দেখা যায়। ছেলে মেয়ে বসে প্রেম করার একটা জায়গার খুব অভাব, এই অনুভূতি আজকাল আসিফাকে কুরে কুরে খায়। 
ভাড়াটিয়ারা ঘর দোর ঠিক রাখছে কিনা খবর নেয়।
_--- আন্টি অনেকদিন পর উপরে উঠলেন
-- কোমরে ব্যথাটা বেড়েছে গো, উঠতে পারিনা।তোমরা কেমন আছো।তোমার মায়ের পায়ের গোড়ালি ঠিক হয়েছে কি
-- প্লাস্টার দিয়েছে, একুশ দিন রাখতে বলেছে ডাক্তার। 
-- বয়স হলে অনেক যন্ত্রণারে মা
 _-- চা দিই আন্টি
--- না, মাগরিবের নামাজ বাদে চা খাই 
--- আপনার সুফিয়া তো এই চেয়ারটায় বসে, কার সাথে জানি ফোন করে, ভিডিও কল করে, ভাব ভালো  না আন্টি।
-- আর বলো না, আমার ছেলে এদেরকে মাথায় উঠিয়ে রাখে। সব সময় তার নিপীড়িত লাঞ্ছিত মানুষকে নিয়ে চিন্তা। ছেলেটা না আমার বড় সোজা সরল,আউয়া।
অবশ্য সুফিয়া আজকাল খুব সুন্দর করে কাজ করে।
-- অয় অয় আন্টি, স্নানের আগে ড্রেনটা পর্যন্ত পরিষ্কার করে, নিজের ঘরের মতো কাজ করে। রান্নাবান্না গুছানো। সব কিছুই দেখেছি করে।
-- আমার বাথরুমটা পরিস্কার রাখে, এই বয়সে বেশি এক্সিডেন্ট হয় বাথরুমে পড়ে। এটা আমার খুব ভালো লাগে।
             কুরবানীর মাংস হান্দেস লাড্ডু বারো হাজার  টাকা দিয়ে সুফিয়াকে আজ বিদায় দেন। বারবার বলে দেন সামনের শুক্রবারে ফিরে আসার জন্য। 
আসিফার খুব কষ্ট হয় সুফিয়াকে ছাড়া। সাত দিন যায়, দশ দিন যায়, বার দিন যায়, পনেরো  দিন যায়, মাস যায় সুফিয়ার পাত্তা নেই। ফোন সুইচড অফ। কোথায় বাড়ি কোথায় ঘর কিছু জানা নেই। শুধু জানে গ্রামের নাম শালগঙ্গা।
              ঘন কুয়াশায় চারদিক ঢেকে গেছে।
গেটে গাড়ির শব্দ শুনলেই দৌড়ে আসিফা জানালা খুলে তাকিয়ে থাকেন।ফেসবুকে ঢুকে দেখেন ' সালমা লকড হার প্রোফাইল।' 
               আসিফার অবস্থা দেখে ভাড়াটিয়া বউটি বলে, আন্টি, আমি তোমাকে বলেছিলাম- ভিডিও কল করে আপনার ঘর ছেলেদের দেখাতো সুফিয়া, মনে হয় কোন ছেলের সাথে চলে গেছে। ওর মোবাইলে রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস দেখেছি।
আসিফা অবাক হয়ে বলে, রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস বুঝে সুফিয়া! 
_-- আজকাল কাজের মেয়েরা কত কিছু করে আন্টি, আপনি জানেন না। আপনি খুবই নরম মনের মানুষ।
                সুফিয়া সত্যি সত্যি ফেসবুক বন্ধুর হাত ধরে চলে যায়। কিছুদিন পর ছেলে যখন জানতে পারে সুফিয়া একটি গরীব ঘরের মেয়ে, মানুষের ঘরে কাজ করে, তখন লাথ মেরে ঘর থেকে বের করে দেয়।
মাঝে মাঝে সুফিয়ার মোবাইল থেকে আসিফার মোবাইলে মেসেজ আসে,  কান্নার ইমোজি দিয়ে। আসিফা মেসেজ দিলে রিপ্লাই দেয় না।
            তিন মাস পর সুফিয়া আসিফার বাড়ি ফিরে  আসে, পায়ে ধরে কেঁদে কেঁদে সব কথা খুলে বলে। ' মামি আমাকে মাফ করে দাও, আমি আর জীবনে তোমার অবাধ্য হব না ' ।   
 আসিফা হাতে আসমান পায়। কথা আর বাড়ায়নি।  
সারাদিন ধরে বৃষ্টি হচ্ছে। বালিশের পাশ থেকে ডায়েরিটা বের করে নতুন করে সুফিয়ার জয়েনিং ডেট লিখে রাখেন আসিফা।
   আজও সুফিয়া আসিফাদের বাড়ি আছে। মোবাইল ও আছে। বলা যায় না কখন কি হয়। তবে ছেলে বলে, মানুষের ভালো করলে একদিন না একদিন এর প্রতিফল পাবে।
ছেলে বিয়ে করেছে। বউ চাকরি করে। আসিফা বিছানা নিয়েছে। শুনা যাচ্ছে নতুন এক সদস্য আসছেন, তাকে স্বাগত। সুফিয়া এখন এই ঘরের হর্তাকর্তা বিধাতা।এ স্বপ্ন না মায়া?

Comments

Popular posts from this blog

ব্রেকআপ